বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), চলনবিল রক্ষা আন্দোলনসহ ২২টি পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বুড়ি পোতাজিয়া এলাকায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ১০০ একর জমি ভরাট করে এই স্থানে ক্যাম্পাস নির্মাণ করা হলে চলনবিলের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হবে এবং কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায়।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনগুলো এ দাবি জানায়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চলনবিল ও বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এস এম মিজানুর রহমান।

সম্মেলনে জানানো হয়, চলনবিল দেশের বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। এটি ৬টি জেলা ও ৩৬টি উপজেলায় বিস্তৃত এবং আয়তন প্রায় ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। বর্ষায় পদ্মা ও যমুনার কূল উপচানো পানি এখানে জমা হয়, যা বন্যার প্রকোপ কমায়। শুষ্ক মৌসুমে ওই পানি নদীতে ফিরে গিয়ে প্রবাহ বৃদ্ধি করে। বিলের ভেতরে রয়েছে ৪৭টি নদী, ১৬৩টি বিল, ৩০০টির বেশি খাল, ১ লাখ ২০ হাজার পুকুর এবং কয়েকটি বড় পাথার। এ জলজ ও স্থলজ পরিবেশে বসবাস করছে প্রায় ১০৫ প্রজাতির দেশি মাছ, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৭ প্রজাতির উভচর, ৩৪ প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী।

বক্তারা বলেন, প্রস্তাবিত বুড়ি পোতাজিয়া এলাকা চলনবিলের যমুনার সঙ্গে একমাত্র পতনমুখ। সেখানে ১০০ একর জমি ৯–১৪ মিটার উঁচু করতে প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনমিটার বালু ভরাটের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। ফলে যমুনার পানি অবাধে চলনবিলে প্রবেশ করতে পারবে না। এতে বিলের নদী–খাল শুকিয়ে যাবে, দেশি মাছের প্রজনন ব্যাহত হবে, মৌসুমি বন্যার ধরণ পরিবর্তিত হবে এবং কৃষিজমি–বসতিসহ আশপাশের এলাকা দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকবে।

সম্মেলনে আরও জানানো হয়, প্রস্তাবিত নির্মাণকাজ হলে বাঘাবাড়ী নৌবন্দর ও আশপাশের জলপথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে বড়াল, গোহালা নদী দিয়ে কৃষিপণ্য ও দুধ মিল্কভিটার বিভিন্ন কেন্দ্রে পৌঁছে। আবার হুড়াসাগর নদীপথ দিয়ে পেট্রোল–ডিজেল বন্দরটিতে আসে, যা উত্তরবঙ্গে সরবরাহ করা হয়। পানিপ্রবাহে বাধা তৈরি হলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও সরবরাহব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।

বাপা ও চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলেন, প্রস্তাবিত ক্যাম্পাস নির্মাণ পরিকল্পনা ২০০০ সালের জলাশয় রক্ষা আইন, ২০১৩ সালের পানি আইন এবং দেশের উচ্চ আদালতের নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার রায়ের পরিপন্থী। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্তকারী স্থাপনা নির্মাণ আইন ও রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন।

সংগঠনগুলো বিকল্প হিসেবে শাহজাদপুরের রবীন্দ্রনাথের কাচারিবাড়ির চারপাশে ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের জমি-সংকটের বাস্তবতায় বিশাল জমি ভরাট না করে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে আধুনিক ক্যাম্পাস গড়ে তোলা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তারা মাত্র ৫ একর জমিতে নির্মিত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের কথা উল্লেখ করেন। দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ১ হাজার ১৫৬ একর জমির একটি অংশ ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন নদী ও জলাভূমিপ্রেমী। তার নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস যদি চলনবিলের পতনমুখ বন্ধ করে নির্মিত হয়, তা হবে দুঃখজনক ও রবীন্দ্র-চেতনার পরিপন্থী। তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান, পরিবেশের ক্ষতি না করে বিকল্প স্থানে আধুনিক ক্যাম্পাস নির্মাণের পক্ষে অবস্থান নিতে।

সম্মেলনে বাপা, চলনবিল রক্ষা আন্দোলন, এএলআরডি, নাগরিক উদ্যোগ, বারসিক, বাদাবন সংঘ, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, পরিবেশ বার্তা, সিডিপি, গ্রীন ভয়েস, গ্রীন সেভার্স, সিডব্লিউএফ, কাপ, উন্নয়ন ধারা ট্রাস্ট, ক্যাপস, তিস্তা নদী রক্ষা কমিটি, নদী পক্ষ, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন, নদী পরিব্রাজক দল, আরডিআরসি, এএসডিএস এবং সেইফটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।