নির্বাচন পরবর্তী দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশুদের উপর পাশবিক নির্যাতন করে হত্যার প্রতিবাদে ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগ। গতকাল শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই মানববন্ধন আয়োজিত হয়। মানববন্ধনে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে ১০ দফা দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নূরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, সরকার প্রধান চারস্তরের নিরাপত্তা ভোগ করেন। তাঁর এমপি-মন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রটোকল ভোগ করেন। কিন্তু জনগণের জান ও মালের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এসময় রামপুরায় শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর থানা পুলিশ মামলা না নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে ঘটনা চেপে যাওয়ার পরামর্শ দেয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। নারী ও শিশু ধর্ষণ-হত্যার চিত্র মূলধারার মিডিয়ায় দেখা না যাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজ পায়ে হেটে যাচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী সাধারণ চেয়ারে বসছেন, এসব নিউজ প্রচারে মূলধারার মিডিয়াকে ব্যস্ত দেখা যায়! তিনি গণমাধ্যমকে সরকারের চাটুকারীতা ছেড়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা চাকরি রক্ষা ও সম্মান পাওয়ার আশায় সরকারের চাটুকারীতা করে তাদেরেকে মনে রাখতে হবে রিজিক এবং সম্মান সরকারের হাতে নয়, এটি আল্লাহর হাতে। নারীবাদী নেত্রীরা আজ কোথায় প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, কথিত ঐসব নারী নেত্রীরা সারাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং খুনের শিকারের ঘটনায় চুপ কেন? বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দিকা আরো বলেন নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগ প্রশ্নবানে জর্জরিত ছিলো জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারবে কিনা, মহিলারা নিরাপদ থাকবে কিনা? আমার প্রশ্ন হলো আসল কাজ কোনটা নারীদের নিরাপত্তা দেয়া না রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া? তিনি বলেন সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় বর্তমান নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী একজন পুরুষ যা খুবই হাস্যকর বিষয়।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের রাজনীতি বিষয়ক সেক্রেটারি ডা. হাবীবা চৌধুরী সুইট, মহিলা বিভাগের মানবসম্পদ ও আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি আমেনা বেগম, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি জান্নাতুল কারীম সুইটি, প্রমুখ। বক্তরা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় জড়িতদের কেবল দল থেকে বহিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, অপরাধীকে গ্রেফতার করে বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রিতা মেনে নেয়া হবে না।

মানববন্ধনে মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় আইন ও মানবসম্পদ বিভাগীয় সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নি বলেন, আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই মব সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অপদস্থ করে অপসারণ করা হচ্ছে। বরিশালে দেখেছি আদালতে হুমকির মাধ্যমে বিচারবিভাগকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। রামপুরার ঘটনায় প্রশাসনকে জানানো হলে তারা বলছে এটা একটা দুর্ঘটনা এটা মাইনা নেন, এটা খুবই লজ্জাজনক। তিনি বলেন আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন চাই।

এসময় মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বিভাগীয় সেক্রেটারি বলেন, কোথায় গেলো সেই নারীবাদী সংগঠনরা যারা নারী ইস্যু নিয়ে গোল টেবিল করেন? আমি চাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে ইস্যু নিয়ে রাস্তায় নেমেছে সকল নারীবাদী সংগঠন নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে এক হন। তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন আমরা চাইনা নারীদের জন্য এই অনিরাপদ পবিরেশ থাকুক। তিনি আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন আপনারা জানান কতদিনের মধ্যে এসব ঘটনার বিচার করবেন, আর যদি দায়িত্ব পালনে আপারগ হন তাহলে সেটাও স্বীকার করেন। ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি জান্নাতুল কারীম সুইটি বলেন সরকারি দল ৫ আগষ্টের পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত ৬৩ টি ধর্ষনের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলো। যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছেন এই শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা তাদের তখত উল্টে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এসময় ঢাকা মহানগরী উত্তর মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি আমেনা বেগম সকল নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমাজের সকর নারীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

মানববন্ধনে ১০ দফা দাবি উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি শূরা ও কর্মপরিষদ সদস্য মারজিয়া বেগম। দাবিগুলো হলো--১. সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে রাষ্ট্রকে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ২. অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৩. এ ধরনের বর্বরতাকে রুখতে রাষ্ট্রকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ৪. রাজনৈতিক পরিচয়ের জের ধরে দুর্বৃত্তদের তা-ব কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। ৬. আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া। ৬. প্রতিটি মা-বোন ও শিশুর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৭. গ্রেপ্তারকৃত অপরাধীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৮. যে প্রভাবশালী চক্র অপরাধীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছে- তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। ৯. মামলা নিতে পুলিশের গড়িমসির তদন্ত করে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ১০. শিশু নিরাপত্তা ও ধর্ষণ-নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে কার্যকর, কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করতে হবে।