* ভিসা দুর্ভোগে শান্তিনিকেতনের বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক শহীদ শরীফ ওসমান হাদীকে হত্যার প্রতিবাদে সাতটি দেশে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে পাঞ্জাবের স্বাধীনতাকামী শিখ সম্প্রদায়ের একাংশ। গতকাল বুধবার ওইসব দেশের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় ভারতীয় দূতাবাসগুলোর সামনে বিক্ষোভ করেন তারা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা শিখস ফর জাস্টিসের (এসএফজে) জেনারেল কাউন্সেল গুরপতওয়ান্ত সিং পান্নু এক ভিডিও বার্তায় এই ঘোষণা দেন। এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই যোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে ভারত। গতকাল বুধবার বার্তাসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হাদীদুল্লাহকে তলব করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত মঙ্গলবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলবের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশের দূতকে পাল্টা তলব করেছে দিল্লি। এ সময় বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শহীদ হাদী হত্যার তদন্তের আহ্বান জানান। এছাড়াও কলকাতার বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনগুলোর বিক্ষোভের কারণে ভারতে বাংলাদেশি ভিসা সেবা অস্থায়ীভাবে বন্ধ থাকায় শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে পিটিআই জানিয়েছে, হাদীকে হত্যার সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্টতা আছে এমন অভিযোগ ওঠায় বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তদন্ত করতে আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি। দুর্বৃত্তের গুলিতে হাদী আহত হওয়ার পর ভারতের দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব দেখা যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছে পিটিআই।
এদিকে মঙ্গলবার ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে ঢাকা। ভারতীয় দূতকে তলব করে পররাষ্ট্রসচিব নয়াদিল্লি ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশের কূটনীতিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। সেদিন ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যাহত উসকানিমূলক বক্তব্যে সরকারের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদীর ওপর হামলাকারীদের ভারতে পালিয়ে যাওয়া প্রতিরোধে দেশটির সহযোগিতা কামনা করা হয়।
অন্যদিকে গত গত ১৭ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাল্টা তলব করা হয়। আবারও সপ্তাহ না যেতেই বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে গত মঙ্গলবার আবারও পাল্টা তলব করে ভারত।
সাত দেশে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে শিখদের বিক্ষোভ: এর আগে ভিডিও বার্তায় শিখ নেতা পান্নুন জানান, ঢাকা, পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ইতালির মিলান, কানাডার টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি শহরে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে এই বিক্ষোভ করে শিখ জনগোষ্ঠী। এ সময় কনস্যুলেটগুলো বন্ধ করার দাবি জানাবেন তারা। শিখ নেতা পান্নু বলেন, গতকাল ‘বুধবার নিজ নিজ স্থানীয় সময় অনুযায়ী দুপুর ১২টায় ভারতীয় কনস্যুলেটগুলো বন্ধ করার কর্মসূচি পালন করে, যাতে বাংলাদেশে ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে ভারতের সরকারের হত্যার পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা যায় এবং মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার উৎখাতের পরিকল্পনার বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে আসে।’
তিনি বলেন, ‘শিখস ফর জাস্টিস বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে যাচ্ছে। ভারত ইতোমধ্যেই ওসমান হাদীকে হত্যা করেছে। আমরা কর্মসূচি হিসেবে ভারতীয় দূতাবাসগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ডাক দিয়েছি। কারণ এগুলোকে আমরা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর কেন্দ্র বলে মনে করি। এখান থেকেই হত্যাকা-ের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হয়। এই শিখ নেতা বলেন, একইভাবে আমরা ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে দায়ী করছি। তিনিই ওসমান হাদীকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন। এই দূতাবাস থেকেই হত্যাকাণ্ড, গুপ্তচরবৃত্তি ও নজরদারির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ কারণে আমরা ঢাকা, ইসলামাবাদ, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ইতালির মিলান, কানাডার টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি থেকে একযোগে কর্মসূচির ডাক দিচ্ছি।
ভিসা দুর্ভোগে শান্তিনিকেতনের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা: ভিসা সেবা স্থগিত থাকায় পৌষ মেলার ছুটিতে দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীরা এখন পরিবারে পৌঁছাতে পারছেন না। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সঙ্গীত, কলা এবং অন্যান্য বিভাগ মিলিয়ে প্রায় ৪০-৫০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছেন। বেশিরভাগ হল এবং ভাড়া বাসায় থাকা শিক্ষার্থীদের ছুটিতে দেশে যাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকলেও তা এখন আটকে গেছে।
এছাড়া ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে থাকা প্রায় ১০-১২ জন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীও ভিসার সমস্যার কারণে ভারত ফিরে যেতে পারছেন না। জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কোর্সের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা থাকায় একাডেমিক ব্যাঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আতিগা ঘোষ বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আশা করি পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে এবং শিক্ষার্থীরা আর কোনো অসুবিধার মুখোমুখি হবেন না।’
কলকাতার বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনগুলোর বিক্ষোভের কারণে ভারতে বাংলাদেশি ভিসা সেবা অস্থায়ীভাবে বন্ধ থাকায় শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। ভিসা সেবা স্থগিত থাকায় পৌষ মেলার ছুটিতে দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীরা এখন পরিবারে পৌঁছাতে পারছেন না। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সঙ্গীত, কলা এবং অন্যান্য বিভাগ মিলিয়ে প্রায় ৪০-৫০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছেন। বেশিরভাগ হল এবং ভাড়া বাসায় থাকা শিক্ষার্থীদের ছুটিতে দেশে যাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকলেও তা এখন আটকে গেছে। এছাড়া ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে থাকা প্রায় ১০-১২ জন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীও ভিসার সমস্যার কারণে ভারত ফিরে যেতে পারছেন না। জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কোর্সের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা থাকায় একাডেমিক ব্যাঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আতিগা ঘোষ বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আশা করি পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে এবং শিক্ষার্থীরা আর কোনো অসুবিধার মুখোমুখি হবেন না।’
পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় বিজেপির সাথে আবারও উগ্র হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থীদের বাংলাদেশবিরোধী বিক্ষোভ
কয়েকদিন ধরে চলমান বাংলাদেশ বিরোধী বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবারও ভারতের বেশ কয়েকটি জায়গায় বিক্ষোভ দেখিয়েছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপিসহ কয়েকটি উগ্র-হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী সংগঠন। বিক্ষোভ হয়েছে ভারত বাংলাদেশের সীমান্ত চেকপোস্ট পেট্রাপোলে। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী আগেই ঘোষণা করেছিলেন, গতকাল বুধবার তারা সীমান্তে প্রতীকী প্রতিবাদ দেখাবেন। সে অনুযায়ী পেট্রাপোলে হাজির হয়েছিলেন বিজেপি সমর্থকরা।
বাংলাদেশের ময়মনসিংহে এক হিন্দু যুবককে আগুনে জ্বালিয়ে হত্যার বিরুদ্ধে তারা স্লোগান যেমন দিয়েছেন, তেমনই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কুশপুত্তলিকাও পোড়ানো হয়। বিজেপির স্থানীয় নেতাকর্মীরাই পেট্রাপোলের ওই বিক্ষোভে হাজির হয়েছিলেন। তবে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ অবশ্য সীমান্তের কিছুটা দূরেই আটকিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীদের।
আবার কলকাতা লাগোয়া হাওড়াতেও বিক্ষোভ করেছেন বিজেপির কর্মীরা। কলকাতার প্রতীক যে বিখ্যাত হাওড়া ব্রিজ তার আগেই পুলিশ ব্যারিকেড করে রেখেছিল বিজেপি কর্মীদের আটকাতে। সেই ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করা হয়। পরে বিজেপিকর্মীরা হাওড়া ব্রিজ অবরোধ করেন। তারাও বাংলাদেশে, তাদের কথায় হিন্দুদের ওপরে অত্যাচারের অভিযোগ তুলে এর বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। অন্যদিকে ত্রিপুরা থেকে খবর পাওয়া গেছে যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে আগরতলায় বিক্ষোভ করছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।
এর আগে গত মঙ্গলবার কলকাতায় বাংলাদেশের উপদূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভ করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, এভিবিপি, হিন্দু জাগরণ মঞ্চসহ সঙ্ঘ পরিবারের একাধিক সংগঠন। এসময় বিক্ষোভকরীরা ব্যারিকেড ভেঙে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে নয়াদিল্লীর চানক্যপুরীতে অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশন অভিমুখে বিক্ষোভ করেছে কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী দল। এসময় বিক্ষুব্ধরা ব্যারিকেড ভেঙে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় এবং ‘বাংলাদেশ মুর্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দিতে কুশপুত্তলিকা পোড়ায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বাজরং দলসহ হিন্দু সংগঠনগুলো। তবে বিক্ষোভকারীদের হাইকমিশন ভবন থেকে ৫০০ মিটার দূরে আটকে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানায় ঘটনাস্থলে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কয়েক স্তরের ব্যারিকেড, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
এর আগে গত শনি ও রোববার (২০ ও ২১ ডিসেম্বর) দিল্লীতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরপর দুদিনই হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে রোববার (২১ ডিসেম্বর) বিকেলে প্রায় দুই শতাধিক দুষ্কৃতকারী হাইকমিশনের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে বাংলাদেশবিরোধী নানা স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে তারা সংঘবদ্ধভাবে হাইকমিশনে হামলা চালায়। দুই দফা হামলার জেরে ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে দেওয়া সব ধরনের সেবা ও ভিসা কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ধরনের সহিংস ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের কারণে হাইকমিশনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা।