সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরানের প্রশাসন। এদিকে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়ে যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে তাদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া চীন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। আঙ্কারার আশঙ্কা এ বিক্ষোভ তেকে ওই অঞ্চলে অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে। রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই, এএফপিম বিবিসি।

ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির প্রশাসন। তবে এই দমন-পীড়ন চললে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ গণবিক্ষোভের মুখে পড়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খোদ ইরানের একজন সংসদ সদস্য। এদিকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়ে যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, তাদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা এ খবর জানিয়েছে। গত মঙ্গলবার ইরানের পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তব্যে ইয়াজদ প্রদেশের প্রতিনিধি মোহাম্মদরেজা সাবাঘিয়ান বলেন, মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষ রয়েছে। সরকার ও পার্লামেন্টের কর্মকর্তাদের উচিত দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করা। অন্যথায় একই ধরনের ঘটনা আরও তীব্রভাবে ফিরে আসবে। গত সোমবার রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে এমন যেকোনও দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানি করলে তাদের ওপর ২৫ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে। বড় তেল রফতানিকারক দেশ ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তেহরান এখনও এই বিষয়ে জনসমক্ষে কোনও প্রতিক্রিয়া না জানালেও ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা চীন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, চীন নিজের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ‘একতরফা নিষেধাজ্ঞা’ ও ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’-এরও বিরোধিতা করেছে বেইজিং। ২৮ ডিসেম্বর স্থানীয় মুদ্রার দরপতন ও চরম অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৬৪৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫০৫ জন বিক্ষোভকারী এবং ১১৩ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। এ ছাড়া ১০ হাজার ৭২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে ইরান সরকার এই রক্তপাতের জন্য বরাবরই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করে আসছে।

বিক্ষোভ দমনে ট্রাম্প সামরিক ব্যবস্থার হুমকি দিলেও নেপথ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংলাপ করা আমাদের দায়িত্ব এবং আমরা অবশ্যই তা করবো। তিনি আরও জানান, তরুণদের ক্ষোভের কারণ বুঝতে সমাজবিজ্ঞানীদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও জানিয়েছেন, সামরিক হামলা একটি বিকল্প হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে ‘কূটনীতিই সব সময় প্রথম পছন্দ’। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে ইরানজুড়ে চলমান বিক্ষোভ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে তুরস্ক। আঙ্কারার আশঙ্কা, এ বিক্ষোভ থেকে ওই অঞ্চলে অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে। বহু দশক ধরে আঙ্কারা ও তেহরান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী। বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক, লেবাননসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুদেশের স্বার্থ বারবার মুখোমুখি হয়েছে। তবে নিজেদের ভেতর যত দ্বন্দ্বই থাকুক, তুরস্কের কাছে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে বলে মনে করেন মুস্তফা চানার। ফিদান মনে করেন, ইরানকে গত ৩০ বছর ধরে নিজেদের উচ্চাকাক্সক্ষী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নীতির মূল্য এখন চুকাতে হচ্ছে। এসব নীতির ফলে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসইটিএর ইরান ও এই অঞ্চলবিষয়ক বিশ্লেষক মুস্তফা বলেন, ‘ইরান-তুরস্ক সম্পর্কে যতই গভীর উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকুক; ইরানের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা তুরস্কের কাছে অগ্রাধিকার পাবে।’ তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বক্তব্যেও দেশটির এই মনোভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

গত শনিবার টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে ফিদান বলেন, বিক্ষোভের জেরে ইরান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবে, এমনটা তাঁদের মনে হয় না। তিনি ইরানে এবারের বিক্ষোভকে ২০২২ সালে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যু ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভের তুলনায় ছোট আকারের বলে বর্ণনা করেছেন। যদিও বিশ্লেষকেরা ফিদানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তাঁদের মতে, ১৯৯৯ সালের পর ইরানে এত বড় আকারের বিক্ষোভ আর হয়নি। ফিদান মনে করেন, ইরানকে গত ৩০ বছর ধরে নিজেদের উচ্চাকাক্সক্ষী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নীতির মূল্য এখন চুকাতে হচ্ছে। এসব নীতির ফলে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইরানের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম প্রাণবন্ত ও সংবেদনশীল। তারা দৈনন্দিন জীবনে নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এবারের বিক্ষোভকারীদের বড় একটি অংশ বয়সে তরুণ। তারা সরকারকে কড়া বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করেন ফিদান। ফিদান বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, সরকার তাদের বার্তা বুঝতে সক্ষম হবে।’ ইরানে বিক্ষোভের পেছনের কারণ নিয়েও কথা বলেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিক্ষোভের মাধ্যমে ইরান সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা করছে ইসরাইল। ফিদান বলেন, ‘একটি বাস্তবতা এটিও যে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিদেশ থেকে এই বিক্ষোভকে প্রভাবিত করছে। হ্যাঁ, বাস্তবতা এটাই। মোসাদ বিষয়টি গোপনও করছে না; তারা নিজেদের ইন্টারনেট ও টুইটার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ইরানি জনগণকে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে আহ্বান জানাচ্ছে।’

অবিলম্বে মার্কিন নাগরিকদের ইরান ছাড়া নির্দেশ

ইরানে চলমান অস্থিরতা আরও তীব্র হওয়ায় মার্কিন নাগরিকদের অবিলম্বে দেশটি ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সোমবার ইরানের জন্য ভার্চুয়াল মার্কিন দূতাবাস এক নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় মার্কিন নাগরিকদের ‘বিলম্ব না করে ইরান ছাড়তে’ নির্দেশ দিয়েছে। নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় দূতাবাস জানায়, এখনই ইরান ছাড়ুন। একই সঙ্গে মার্কিন নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়াই দেশত্যাগের পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে। যারা কোনো কারণে ইরান ছাড়তে পারছেন না, তাদের উদ্দেশে সতর্কবার্তায় বলা হয়, যদি আপনি দেশ ছাড়তে না পারেন, তাহলে নিজের বাসভবনের ভেতরে অথবা অন্য কোনো নিরাপদ ভবনে অবস্থান করুন।

এছাড়া সতর্কবার্তায় ইরানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের ভবিষ্যতে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি মাথায় রেখে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি নিরাপদ থাকলে স্থলপথে আর্মেনিয়া অথবা তুরস্ক হয়ে ইরান ছাড়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে। সতর্কবার্তায় আরও জানানো হয়, মার্কিন-ইরানি দ্বৈত নাগরিকদের ইরান ত্যাগ করতে হলে অবশ্যই ইরানি পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে। কারণ, ইরান সরকার দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি দেয় না ও দ্বৈত নাগরিকদের শুধুমাত্র ইরানি নাগরিক হিসেবেই বিবেচনা করে। ভার্চুয়াল দূতাবাস সতর্ক করে জানায়, মার্কিন পাসপোর্ট দেখানো বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে- এমন কোনো প্রমাণ দেখানোই ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে কাউকে আটক করার যথেষ্ট কারণ হতে পারে।

হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংকট নিরসনে কূটনীতিই অগ্রাধিকার পাচ্ছে, তবে প্রয়োজনে বিমান হামলার মতো কঠোর সামরিক পদক্ষেপও গ্রহণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনে জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প সর্বদা সব ধরনের বিকল্প খোলা রাখতে পছন্দ করেন। তার ভাষায়, কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্টের সামনে থাকা অসংখ্য বিকল্পের মধ্যে বিমান হামলা অন্যতম একটি পথ। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগে পিছপা হন না এবং ইরান এটি খুব ভালোভাবেই জানে। তবে মার্কিন প্রশাসন কূটনৈতিক আলোচনাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।