একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটছেই দেশে । এ সব ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একটি টার্গেট কিলিংয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দারা এ ধরনের হত্যাকান্ড বন্ধ করতে পারছে না। এ ধরনের হত্যাকান্ডের কারণে সরকারের উপর নানা মহলের চাপও বাড়ছে। পেশাদার কিলারদের নিশানায় রাজনৈতিক খুনোখুনি বাড়ার হার বিগত দিন বা বছরগুলোর চেয়ে বেশিই ঘটছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা প্রতিহিংসা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পড়ে খুন হচ্ছেন। বেসরকারী মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১ বছরে পেশাদার সন্ত্রাসীদের টার্গেটে ১০৮ রাজনৈতিক নেতাকর্মী নৃশংসভাবে খুনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন।

অপরাপর অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, টার্গেট কিলিং বন্ধ করতে হলে পেশাদার অপরাধীদের ডাটাবেজ তৈরী করে গ্রেফতারে জোরালো অভিযান চালাতে হবে। পাশাপাশি সব ধরনের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তা না হলে হত্যার ঘটনা ঘটতে থাকবেই। সরকারসহ আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এই উদ্যোগের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সংশ্লিষ্টতা থাকলে ভালো।

পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইজি পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৃহস্পতিবার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকায় যখন খুন বা অণ্য কোন অপরাধ বাড়ে তখন এর প্রভাব সারাদেশেই পড়ে। বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক খুনোখুনি শুরু হয়। গত ১৬ মাসে ঢাকায় বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যকান্ড ঘটেছে টার্গেট করে। এর অধিকাংশ গুলী করে করা হয়েছে। এসব হত্যাকান্ডের পর ঢাকায় যেভাবে ডিএমপির তৎপর হওয়ার প্রয়োজন ছিলো সেভাবে ডিএমপি হতে পারেনি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানও নেই। আগে ডিএমপি ও ডিবির অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং দাগী অপরাধীদের গ্রেফতারে জোরালো অভিযান ছিলো। কিন্ত গত ১৬ মাসে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা পেশাদার কিলার হিসেবে যেসব সন্ত্রাসী কাজ করে তাদের গ্রেফতারে কোন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারেও তৎপরতা নেই। ফলে দাগী অপরাধীরা এখন টার্গেট কিলিং নির্বিঘ্নে করার সুযোগ পাচ্ছে।

পুলিশের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, অবেধ অস্ত্র উদ্ধারে জোরালো অভিযান শুরু না হলে টার্গেট কিলিং আরো বাড়বে। নিয়মিত তল্লাসী ও চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশের কার্যক্রম আরো জোরালো করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসহ অপরাধ প্রবণ এলাকায় পুলিশের নিয়মিত তল্লাসী, চেকপোস্ট এবং অভিযান জোরদার হলে অপরাধীরা টার্গেট কিলিং এর মতো অপরাধে জড়াতে সাহস পাবে না।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, একটি হত্যাকাণ্ডের পর (বিশেষভাবে রাজনৈতিক দলের নেতা) নির্বাচন কমিশন বা কোন কোন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেন এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এ ধরনের বক্তব্যের কারণে অপরাধীরা মনে করে তারা কাউকে টার্গেট করে হত্যা করলে এটি কোন না কোন রাজনীতি হবে। তারা পার পেয়ে যাবে। এখন কথা হচ্ছে টার্গেট কিলিং যখন শুরু হয়েছে তখন যে অভিযান জোরালো দরকার ছিলো সেই ধরনের অভিযান আমরা দেখছি না। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পৃথক অভিযানের কথা আমরা বলেছি যে অস্ত্র উদ্ধারে পৃথক অভিযান শুরু করা হবে। কিন্ত ডেভিল হান্ট অভিযানে ফেজ ১ ও ২ এ গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারের যে সফলতা সেটি দৃশ্যমান নয়। ফলে ঝুকি থেকেই গেছে। আর এ ঝুকির কারণে টার্গেট কিলিং বাড়ছে যা নির্বচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি পদ মর্যদার এক কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙ্গে পড়েছিলো। এর মূল কারণ জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামীলীগ সরকারের নির্দেশে পুলিশ আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে গুলী চালিয়ে হত্যা করেছে। এই থানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলী লুট হয়। পুলিশ মানসিকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে যা এখনো ঠিক হয়নি। অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। মেট্টোপলিটন এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্বপালনকারী পুলিশ কমকর্তাদের জেলা এবং জেলা থেকে মেট্টোপলিটনে আনা হয়েছে। বদলী হয়ে আসলেও নতুনভাবে যেভাবে মাঠ পর্যায়ে পুলিশকে সাজানো হয়েছে সেখানে দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ সদস্যের ঘাটতি রয়েছে। ফলে তারা অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ওই কর্মকর্তা বলেন, আন্দোলনের সময় বিপুল সংখ্যক দাগী অপরাধী জেল থেকে পালিয়ে গেছে। আবার বিগত সরকারের সময় যেসব অপরাধীদের ডাটাবেজ ছিলো সেগুলো অনেক থানায় হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে নতুনভাবে যেসব পুলিশ দায়িত্বে এসেছে তারা নিজ নিজ থানা এলাকার অপরাধ এবং অপরাধী সম্পর্কে ধারণা নেই। গত ১৬ মাসে পুলিশ স্থায়ীভাবে থানা এলাকায় দায়িত্বে থাকতে পারেনি। ফলে অপরাধীদের নতুনভাবে ডাটাবেজ তৈরি, এলাকার অপরাধ সম্পর্কে ধারণার ঘাটতি রয়েছে। এতে, পুলিশ সঠিক ভাবে কাজ করতে পারছে না।

গত বুধবার রাতে কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলী করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তরের স্বেচ্ছাসেবকদলের নেতা আজিজুর রহমান মোকাব্বিরকে। এ সময় রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা সুফিয়ান বেপারীও গুলীবিদ্ধ হন। প্রকাশ্যে বিএনপি নেতাকে গুলী করার ঘটনায় নড়েচড়ে বসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকা ৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে সতন্ত্র নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার টার্গেটে গুলী করা হয়। ৬ দিনের মাথায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওসমান হাদির মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শুটার এবং পরিকল্পনকারী বা হত্যার নির্দেশদাতাদের পরিচয় শনাক্ত হলেও নেপথ্যের অর্থদাতা ও নির্দেশদাতা কারা তা পরিস্কার হয়নি। মাত্র ২০দিনের তদন্তে ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিলেও মূল শুট্যার এবং নিদের্শদাতাসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ঢাকায় এ দুই আলোচিত হত্যকান্ড ছাড়াও ঢাকার বাইরে একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারা টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইআরএসসি) সুত্র জানায়, গত ১ বছরে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের টার্গেট করে ১৬৯ টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ২৫০ জনের বেশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে টার্গেট করে গুলী করা হয়েছে। গুলী করে এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে (কুপিয়ে) ১০৮ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাগুলো বিস্তারিত অণুসন্ধান করার সুযোগ না থাকলেও বিভিন্ন খবরে এসেছে এরা টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন।

সাম্প্রতিক টার্গেট কিলিং

পুলিশ এবং বিভিন্নসূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, গত ৩ জানুয়ারি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলী করে হত্যা করা হয়। গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে স্থানীয় বিএনপি নেতা জানে আলম শিকদারকে মোটর সাইকেলে আসা মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা গুলী করে হত্যা করে। গত ৭ জানুয়ারি ফরিদপুরে বোয়ালমারিতে পুলিশ পরিচয় দিয়ে বাসায় ঢুকে সাইফুল সর্দার নামে এক বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। গত ১৫ জানুয়ারি লক্ষ্মিপুরের চন্দ্রগঞ্জে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারন সম্পাদক আবুল কালাম জহিরকে কুপিয়ে ও গুলী করে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যদিও এ ঘটনায় পুলিশ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকার ধামরাইয়ে স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্যে পিটিয়েও চোখ উপড়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি মোহাম্মদ বাবুল মিয়াকে। গত বছরের ৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের রাউজানে মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম নামের এক বিএনপি নেতাকে গুলী করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২ জুলাই ঢাকার দোহার উপজেলায় ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি হারুন অর রশিদ মাস্টারকে গুলী করে হত্যা করা হয়। ঘটনারদিন নদীর পাড়ে হাটতে যাওয়া বিএনপি নেতা হারুন মাস্টারকে মোটর সাইকেলে আসা ৩ যুবক লক্ষ্য করে গুলী চালায়। পরে তার মৃত্যু হয়। গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারী শেরপুরে জেলার সদর উপজেলার বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক জাকারিয়া বাদলকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা। গত বছরের ২৫ মে বাড্ডায় বিএনপি নেতার অফিসের সামনে গুলী করে হত্যা করা হয় কামরুল আহসান সাধনকে। রাতে কয়েকজন ঘনিষ্টজনকে নিয়ে তিনি আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় মোটর সাইকেলে এসে দুজন মুখোশধারী যুবক টার্গেট করে বিএনপি নেতা সাধণকে গুলী করেন। ঘটনাস্থলেই সাধনের মৃত্যু হয়। গুলীবিদ্ধ হন আরেকজন বিএনপি নেতা।

সন্দেহের তীর নিষিদ্ধ আ’লীগের দিকে?

জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, হত্যা ও আইনশৃঙ্খলাজনিত অরাজক পরিস্থিতি তত বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ কারনে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক-উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। তবে, এ দেশে আইনশৃঙ্খলার এমন চিত্র অবশ্য নতুন নয় বলেও উল্লেখ করছেন তারা। তাদের মতে, বিগত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেও একই রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এ পর্যন্ত যত সংসদ নির্বাচন হয়েছে, প্রায় সবটিরই আগে-পরে টার্গেট কিলিং হয়েছে। শুধু কিলার এবং এর চক্রের পরিবর্তন হয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার এ ধরনের খুনের প্রকৃত বিচার কোনদিন হয়নি। নির্বাচনের পর, নির্বাচিত সরকার সেসব খুনের বিষয়ে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। যে কারণে এ ধরনের খুন, প্রায় রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে গেছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। যেহেতু প্রধানমন্ত্রীসহ বিগত সরকারের মূল নেতৃত্ব দেশত্যাগী, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন, সেহেতু সন্দেহের তীর তাদের দিকেই। বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যাচ্ছে ভারতে বসে এ ধরনের টার্গেট কিলিংয়ের নেতৃত্ব তারাই দিচ্ছে।