নির্বাচনী প্রচারে জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের উপর হামলা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

গতকাল সোমবার আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি এ অভিযোগ করেন। সিইসি সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, সাবেক সচিব ড. খ. ম. কবিরুল ইসলাম ও জামায়াতের মিডিয়া বিভাগের সদস্য অলিউল্লাহ নোমান। বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে উপস্থিত আরও ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আমাদের নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত নারী কর্মীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা ও হয়রানি করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় তাদের নাজেহাল করা হচ্ছে, অপদস্ত করা হচ্ছে। এমনকি কোথাও কোথাও নেকাব পরিহিত অবস্থায় নারীদের নেকাব খুলতে বাধ্য করা হচ্ছে। অনেকের হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকা-১৫ আসনসহ ঢাকার বিভিন্ন আসন এবং দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের ঘটনা পরপর ঘটছে। আজও (সোমবার) কয়েকটি স্থানে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়টি আমাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।

দেশের মোট ভোটারের অর্ধেক নারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই নারী ভোটাররা নারীদের সঙ্গে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এটি একটি ইতিবাচক দিক যে, নারীরা রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ১২ তারিখের গণভোটে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সব দলের নারীরাই কাজ করছেন। আমরা তাদের জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটি বড় রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আমাদের নারী কর্মীদের ওপর মারাত্মক আচরণ করা হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক এবং পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এসব বিষয়ে আমরা বিস্তারিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছি এবং অনুরোধ করেছি যেন রিটার্নিং অফিসার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ মাঠে দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই যথাযথ ভূমিকা পালন করেন।

জুবায়ের বলেন, আমরা কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগও জানিয়েছি। কিন্তু বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি আমরা অনেক জায়গায় দেখতে পাচ্ছি না। একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই এসব কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

জামায়াত নেতা বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা আলোচনা করেছি, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা যখন নির্বাচনী কাজে যুক্ত হচ্ছেন, তখন স্থানীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটরাও তাদের কাজে বাধা দিয়েছেন এবং জরিমানা করেছেন। আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক যদি নিজেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে তিনি কীভাবে নির্বাচনী কর্মী হতে পারবেন না, এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি, এ ধরনের ঘটনা পত্রিকায়ও এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো থেকে আমরা সরাসরি তথ্য দিয়েছি। একজন শিক্ষককে এভাবে নাজেহাল বা জরিমানা করলে তার সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণœ হয়। এটা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। কমিশন জানিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনি ব্যাখ্যা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আইনি ব্যাখ্যার অসুবিধার কারণে কোনো শিক্ষকের সম্মানহানি হোক, এটা কেউ চায় না।

জুবায়ের বলেন, এছাড়া আমরা বারবার যে বিষয়টি তুলে ধরছি, আজও তা বলেছি, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এ বিষয়ে সার্কুলার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা বলেছি, বাস্তবে এখনো তা দৃশ্যমান নয়। যেসব কেন্দ্রে ক্যামেরা বসানো হয়েছে, তার সংখ্যাও অর্ধেকের কম। অনেক ক্ষেত্রে ক্যামেরা কেন্দ্রের বাইরে স্থাপন করা হয়েছে, ভেতরের কোনো ঘটনা বা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি রেকর্ড করার সুযোগ নেই। আমরা বলেছি, এটি বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ হতে হবে। এ বিষয়ে আমরা প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছি। আমরা চাই, সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন হোক, যাতে কোনো অনাকাক্সিক্ষত বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম কেউ করতে না পারে এবং একটি সুন্দর, নিরাপদ নির্বাচনে জনগণ অংশগ্রহণ করতে পারে।

তিনি বলেন, কিছু জেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়েও আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, তারা নির্লজ্জভাবে একটি দলের পক্ষে ভূমিকা পালন করছেন। আমরা বলেছি, প্রয়োজনে এসব বিষয় জাতির সামনে তুলে ধরতে আমরা বাধ্য হব। সে জন্যই আগেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি, যেন তারা সবাইকে নিরপেক্ষ অবস্থানে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

জামায়াতের এ নেতা বলেন, আরেকটি বিষয় আমরা স্পষ্ট করেছিÑপ্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালট। প্রবাসীরা জানেন, ভোট দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২৫ তারিখ। তবে নির্বাচন কমিশন আমাদের জানিয়েছে, প্রয়োজনে আরও দুই-তিন দিন সময় দেওয়া যেতে পারে। মূল বিষয় হলো, ব্যালট ১২ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছাতে হবে। সেক্ষেত্রে ৩০ বা ৩১ তারিখ পর্যন্ত পোস্ট অফিসে ব্যালট জমা দিলেও তা সময়মতো পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে। তিন দিন ছুটি থাকার কারণে অনেক প্রবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ছিল। কমিশন আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে বাস্তবতা বিবেচনায় তারা বিষয়টি দেখছে। আমরা এই বার্তাটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে পৌঁছে দেব। আজ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি বলা হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। প্রবাসীদের মধ্যে এটি একটি বড় উদ্বেগ ছিল, কারণ তারা প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এখন আশা করছি, তারা কিছুটা সময় পাবেন, আশ্বস্ত হবেন এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

জামায়াতের কোনো নারী প্রার্থী না থাকার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জুবায়ের বলেন, আমাদের দলে প্রার্থী নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা তৃণমূল পর্যায় থেকে স্থানীয়ভাবে পরামর্শ গ্রহণ করি এবং সেই পরামর্শের ভিত্তিতেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত মানা বাধ্যতামূলক। তবে নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে আমরা বাধ্যবাধকতা আরোপ করি না। কারণ একজন নারীকে তার পরিবার, সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় তিনি রাজনীতি করবেন কি না। অনেক নারী রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান, কিন্তু নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নন। বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই আমরা এ নীতিটি অনুসরণ করি।