ইসলামী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ছাত্র শিবির আয়োজিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত ঘটনার তথ্যচিত্র প্রদর্শনী ও সেমিনারে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তার বিপরীতে গুম করেছে। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল। শুধুমাত্র একটি ছাত্রসংগঠনের ওপর কী নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ছাত্রশিবিরের দিকে তাকালে বোঝা যায় ।

গতকাল বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ছাত্রশিবির আয়োজিত তথ্যচিত্র প্রদর্শনী ও সেমিনারে এ মন্তব্য করেন তিনি। সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় মানবাধিকার সম্পাদক সিফাত উল আলমের সভাপতিত্বে ও ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার সেক্রেটারি ইমদাদুল হকের সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম। প্রধান বক্তা ছিলেন ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আব্দুল্লাহিল আমান আজমী, কর্নেল (অব:) হাসিনুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির এবং গবেষক আলী আহমেদ মাবরুর এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আহত, পঙ্গুত্ববরণকারী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা, গুম ও নিহত ব্যক্তির পরিবার-পরিজন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিরাজুল ইসলাম বলেন, একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তার বিপরীতে গুম করেছে। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল। শুধুমাত্র একটি ছাত্রসংগঠনের ওপর কী নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ছাত্রশিবিরের দিকে তাকালে বোঝা যায়। বিগত সময়ে সরকার দল ছাড়া বিরোধী দল ও মতের প্রায় সকলেরই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।

সরকারে থাকা ছাত্র উপদেষ্টারা দায়িত্ব পালনে শতভাগ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের পরে তিনজন ছাত্রদের হয়ে মন্ত্রিপরিষদে গিয়েছিলেন, উপদেষ্টা পরিষদে গিয়েছেন। তাদের দায়িত্বটা ছিল, বেসিক দায়িত্ব ছিল, যারা জুলাই গণহত্যা সংঘটিত করেছে, তাদের বিচারটা নিশ্চিত করা; আহত, পঙ্গুত্ববরণকারীÑতাদের সেবা, চিকিৎসার ব্যবস্থাগুলো করা। এই কাজগুলো তারা না করে, তারা সেখানে গিয়ে রুটিন একটা ওয়ার্ক করেছেন। নিজেদের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করার জন্য রাজনীতি করার মানসিকতা, উচ্চাভিলাষিতা তাদের দায়িত্ব থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে রেখেছে।

শিবির সেক্রেটারি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত করা সম্ভব হয়নি। ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের পরিবর্তন লক্ষণীয় নয়। যেকোনো একটা রাজনৈতিক দলের তাঁবেদারি করার এমন মানসিকতাগুলো আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। এই জায়গাগুলো পরিবর্তন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, সমাজে মানুষের অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হোকসে আশা আমরা রাখি।’

সেমিনারে অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, এই মুহূর্তে আমরা জাতি হিসেবে খন্ড বিখন্ড হয়ে গিয়েছি। আমাদের মধ্যে ঐক্য নাই। আমাদের দেশের আগে ক্ষমতার চিন্তা। এ জন্য আমরা প্রকৃত অর্থে কোনো কিছুতে আগাতে পারছি না। আমাদের নিজেদের চিন্তা করতে হবে আমরা কেন আজকে এই অবস্থায় আছি। যারা করছে, তারা কেন করছে? আমাদের নিজেদের সংশোধন হতে হবে। আমার আশপাশে যারা আছে, যাদের প্রভাবিত করতে পারি, তাদের সংশোধন করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘হাশরের ময়দানে এই মিজান (দাঁড়িপাল্লা) থাকবে। ধানের শীষ থাকবে না, নৌকাও থাকবে না, লাঙ্গলও থাকবে না আমরা এমন একটা প্রতীক নিয়ে কাজ করি, যেটা দুনিয়াতেও থাকবে, আখিরাতেও থাকবে।’

সেমিনারে ছাত্রশিবির জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৫৫ জন নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন এরমধ্যে সাত নেতাকর্মী এখনো ফেরেনি।

ছাত্রশিবির জানিয়েছে, গত ১৫ বছরে তাদের ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩১২ নেতাকর্মীর নামে মামলা দেওয়া হয়েছিলো। মামলার সংখ্যা ১৮ হাজার ৩৫টি। যার মধ্যে গ্রেফতার হয়েছিলো ৬৬ হাজার ২৪০ জন। এরমধ্যে রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৯ হাজার ৭২২ জন। মোট রিমান্ড ছিলো ২৯ হাজার ৯৭১ দিন।

শিবির জানায়, ১৫ বছরে তাদের আহত হয়েছিলো ৩১ হাজার ৭১৫ নেতাকর্মী, পঙ্গু হয়েছেন ৩২৪ জন, আর নিহত হয়েছেন ১০৩ জন। এছাড়াও গুমের শিকার ২৫৫ নেতাকর্মী, যাদের ৭ জন এখনো ফেরেনি। সেই সাতজন হলেন মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ, মুহাম্মদ মুকাদ্দাস আলী, হাফেজ জাকির হোসাইন, জয়নুল আবেদীন, মো. কামারুজ্জামান, মো. রেজওয়ান ও শফিকুল ইসলাম।

ছাত্রশিবিরের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ছাত্রশিবির বলছে, ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিরবচ্ছিন্ন পথচলার সূচনা। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এ কাফেলার যাত্রা ছিলো বাধা-বিপত্তিতে পরিপূর্ণ। বিগত ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত বিপ্লব পর্যন্ত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ছাত্রশিবিরের সব স্তরের কর্মীদের ওপর চালানো হয়েছে অত্যাচারের চরম স্টিমরোলার। এমন কোনো হীন পদ্ধতির নির্যাতন নেই যা ছাত্রশিবিরের ওপর প্রয়োগ করা হয়নি। প্রকাশ্যে হত্যা কিংবা অপ্রকাশ্যে গুম, রাজপথে হামলা কিংবা রিমান্ডে নির্যাতন, মিছিল থেকে গ্রেফতার অথবা বাসা থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় ধরে নিয়ে যাওয়া কিছুই বাদ পড়েনি।

সংগঠনটি বলছে, আমাদের অফিস, মেস, সম্পদ সবকিছু থেকেই আমাদের উৎখাত করা হয়েছে। ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেন এবং শফিকুল ইসলাম মাসুদকে গ্রেফতার করে দিনের পর দিন রিমান্ড নিয়ে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়। সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলামকে বুয়েট ক্যাম্পাস থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে ছাত্রলীগ চরমভাবে নির্যাতন করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

তারা জানিয়েছে, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী বুয়েটের শহীদ আবরার ফাহাদকে সারারাত নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও একটি করুণ উদাহরণ। এ রকম হাজারো আবরার ফাহাদের মতো ছাত্রদের শুধুমাত্র ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে নির্যাতন করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হতো। ঝিনাইদহের শহীদ সোহানকে গ্রেফতার করার পর পুলিশ নির্মমভাবে হত্যা করে। শুধু হত্যাই নয় তার দু-চোখ পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত বিগত ১৬ বছরে ছাত্রশিবিরের মোট ১০৩ জনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে শহীদ করা হয়। সাবেক ঝিনাইদহ জেলা সভাপতি ইবনুল পারভেজ, সাবেক সাতক্ষীরা শহর সেক্রেটারি আমিনুর রহমানসহ সারাদেশে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষী প্রায় ৮৬ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশ বাহিনী।

ছাত্রশিবির জানায়, অনেক ক্ষেত্রে গ্রেফতার করতে এসে ব্যক্তিকে না পেলে পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আওয়ামী সরকারের সময় পুলিশ সদস্যদের ব্যবহার করে বুলডোজার দিয়ে অনেক নেতাকর্মীর বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।