লাইলাতুল কদরের ছুটির সঙ্গে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে টানা সাতদিনের ছুটি। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে আগেভাগেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটে যাচ্ছেন মানুষ। তবে যাত্রাপথে কিছুটা বাড়তি ভাড়ার অভিযোগও রয়েছে যাত্রীদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর শাহবাগ, ধানমন্ডি, পল্টন, ফার্মগেট, মিরপুর রোড, শ্যামলী, উত্তরা, মহাখালী, বনানী, রামপুরা, বাড্ডা ও মালিবাগ এলাকায় ট্রাফিক সিগন্যালগুলো দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকছে। অনেক জায়গায় সিগন্যাল ছাড়লেও ধীরগতির কারণে গাড়ি এগোতে পারছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বা সিএনজিতে বসে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন যাত্রীরা। পল্টন থেকে গাবতলী যাওয়ার পথে যানজটে আটকে পড়া নাজির হোসেন বলেন, বিজয় নগর, কাকরাইল ও কারওয়ান বাজারের জ্যাম ঠেলে ফার্মগেট পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। ছুটি শুরুর আগে আজ (সোমবার) শেষ দিনের অফিস হওয়ায় মনে হচ্ছে সব মানুষ একসঙ্গে বাড়ি যেতে রাস্তায় নেমে এসেছে।
একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান ধানমন্ডি থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী শামীম রেজা। তিনি বলেন, অফিস থেকে বের হওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একই জায়গায় বসে আছি। গাড়ি খুব ধীরে এগোচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডগুলোতেও প্রচ- ভিড়। অনেক যাত্রী আবার বাস না পেয়ে রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশার ওপর নির্ভর করছেন। ফলে এসব পরিবহনেও হঠাৎ ভাড়া বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালগুলোতে দুপুর থেকেই যাত্রীদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই আগেভাগে এসে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। গাবতলী বাস টার্মিনালের একজন কাউন্টার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ছুটি উপলক্ষে সকাল থেকেই বিভিন্ন জেলার টিকিটের চাহিদা বেড়েছে। সন্ধ্যার পর যাত্রীচাপ আরও বাড়তে পারে। দূরপাল্লার বাসগুলো সময় মতো টার্মিনাল ছেড়ে গেলেও ঢাকা থেকে বের হতে কিছুটা সময় বেশি লাগছে। আবার যানজটের কারণে ঢাকায় প্রবেশের পর টার্মিনালে পৌঁছুতেও বাসগুলোর বেশ সময় লাগছে। শুধু গাবতলী নয়, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালেও ঘরমুখো যাত্রীদের বেশ ভিড় দেখা গেছে। মহাখালী থেকে উত্তরা সড়কে দুপুর থেকেই তীব্র যানজটের চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের ছুটির কারণে আজ (সোমবার) থেকেই অনেক মানুষ একসঙ্গে ঢাকা ছাড়ছেন। এ কারণে সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশ নিরলস কাজ করছে, যেন যানবাহন দ্রুত চলাচল করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোমবার ইফতার শেষে সন্ধ্যার পর আরও বেশি মানুষ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। এতে রাজধানীজুড়ে যানজট আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাফিক পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, সন্ধ্যার পর চাপ কিছুটা বাড়বে। তবে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
জানা গেছে, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২১ মার্চ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে। সম্ভাব্য এ তারিখ ধরে আগেই ১৯ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত পাঁচদিনের ছুটির তারিখ নির্ধারণ করে রেখেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে ১৭ মার্চ শবে কদরের ছুটি। এর পরদিন ১৮ মার্চ ছুটি হওয়ার ফলে এবার ঈদ উপলক্ষে টানা সাতদিনের ছুটি পাচ্ছেন সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরিজীবীরা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত ৭ মার্চ জারি করা ছুটির প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে কার্যবণ্টন (কার্যপ্রণালি বিধিমালা, ১৯৯৬)-এর তফসিল অনুযায়ী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাবলে এ ছুটি নির্বাহী আদেশে ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত ছুটির দিনে দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে।
তবে জরুরি সেবাগুলো এই ছুটির আওতার বাইরে থাকবে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ, ফায়ার সার্ভিস, বন্দর কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট, ডাক সেবা এবং এসব সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যানবাহন ও কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া হাসপাতাল ও জরুরি চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মী এবং ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী যানবাহনও এই ছুটির আওতার বাইরে থাকবে। জরুরি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোও খোলা থাকবে।
যাত্রীসেবায় নানা সুবিধা: এদিকে নতুন সরকারের সময়ে যাত্রীসেবায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ঈদ সামনে রেখে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের জন্য বিনা মূল্যে কুলি (পোর্টার) সেবা, ট্রলি ও হুইলচেয়ারসহ নানা সুবিধা চালু করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর বন্দর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, নতুন সরকারের সময়ে যাত্রীদের কল্যাণে আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে সদরঘাটের ওপরের অংশ কিছুটা পরিচ্ছন্ন থাকলেও ভেতরের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। এবার পুরো এলাকায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে এখন ঘাট অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন। ঘাট সূত্রে জানা গেছে, ঈদযাত্রীদের সুবিধার্থে ঈদের আগে পাঁচ দিন এবং পরে পাঁচ দিন করে মোট ১০ দিনের জন্য বিনা মূল্যে কুলি সেবা দেওয়া হবে। এসব কুলিকে বিআইডব্লিউটিএ নিজস্বভাবে মজুরি দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে, যাতে যাত্রীরা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন।
এছাড়া, যাত্রীদের মালামাল বহনের সুবিধার্থে ১০০টি ট্রলি রাখা হয়েছে, যেগুলো বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে। যাত্রীরা চাইলে নিজেরাই এসব ট্রলি ব্যবহার করতে পারবেন। সেই সঙ্গে অসুস্থ, অক্ষম ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ারের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে সীমিত সংখ্যক হুইলচেয়ার ছিল, এবার সদরঘাটের ২০টি গেট এলাকায় মোট ৪০টি হুইলচেয়ার রাখা হয়েছে। এসব ব্যবহারে সহায়তা করবেন ক্যাডেট সদস্যরা। ঈদযাত্রায় বাড়তি চাপ সামাল দিতে সদরঘাটে অতিরিক্ত দুটি ঘাট চালু করা হয়েছে বলেও জানান বন্দর পরিচালক। অন্যদিকে, ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের স্বস্তি দিতে লঞ্চ মালিকরা ভাড়া ১০ শতাংশ কমিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সে সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়ন হয় তা নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে।
যা বলেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী: নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, এবারের ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা বিঘিœত করার মতো বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। তারপরও যাত্রীদের সেবার মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাই সতর্ক থাকবেন। গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল পরিদর্শনকালে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি জানান, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সদরঘাট থেকে নদীপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শেখ রবিউল বর্তমানে নৌপরিবহনের পাশাপাশি সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিদর্শনকালে মন্ত্রী লঞ্চ টার্মিনালের বিভিন্ন গেট, যাত্রীসেবা কেন্দ্র ও ব্যবস্থাপনা ঘুরে দেখেন এবং ঈদে বাড়ি ফেরা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের খোঁজখবর নেন। এসময় তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান ও হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শেখ রবিউল বলেন, ঈদযাত্রায় যাত্রীদের সেবা দিতে হবে। আমরা চাই তারা যেন নির্বিঘেœ ও স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারেন। সেই লক্ষ্যেই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবারের ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা বিঘেœর মতো বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। তারপরও সতর্ক থাকবো, যাতে যাত্রীসেবার মান বজায় থাকে। পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী ঘাট শ্রমিকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। এসময় তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, শ্রমিকদের কারণেই আমাদের বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আপনারা ঈদযাত্রায় ঘাট ব্যবহার করা যাত্রীদের সহযোগিতা করবেন। মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করলে যাত্রীরাও আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। কোনো যাত্রী যেন হয়রানির শিকার না হন।