- মিসাইলের ভয়ে সারারাত বাঙ্কারে লাখো ইসরাইলী
- যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ কোটি ডলার দামের থাড রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস
- ইরানের পক্ষে অবস্থান ইউরোপীয়দের
- প্রতিবেশী দেশ থেকে হামলা না হলে আক্রমণ করবে না ইরান
মুহাম্মদ নূরুল হুদা : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকির পর ইরানও হামলা চালানোর জন্য নতুন মার্কিন স্থাপনা খুঁজছে। ইরানের পক্ষ থেকে আসা ব্যালাস্টিক মিসাাইল হামলার মুখে লাখ লাখ ইসরাইলী নাগরিককে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে। এদিকে ৩০ কোটি ডলার মূল্যের রাডার ধ্বংস হওয়ায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এছাড়া হরমুজ প্রণালির কাছে ‘প্রিমা’ নামে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। প্রকাশিত অপর এক খবরে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সামরিক হামলার বিরুদ্ধে ইউরোপের জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা সামরিক হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। সর্বশেষ ইরানের প্রেেিসডন্ট বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আগে হামলা না হলে তারা আর কোনো আক্রমণ চালাবে না। রয়টার্স, আনাদুলো, সিএনএন, আল-জাজিরা, এএফপি, ফক্স নিউজ, টাইমস অব ইসরাইল, তাসনিম, টাইমস অব ইন্ডিয়া।
ট্রাম্পের হুমকির পর ইরানও হামলার জন্য নতুন মার্কিন স্থাপনা খুঁজছে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির পর ইরানও হামলা চালানোর জন্য নতুন মার্কিন স্থাপনা খুঁজছে বলে জানিয়েছেন ইরানের একজন কর্মকর্তা।
গতকাল শনিবার ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে হুমকি দেন, গতকালই ইরানে কঠোর আঘাত হানা হবে বলে তিনি জানান। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং নিশ্চিত মৃত্যুর’ জন্য নতুন লক্ষ্যবস্তু বিবেচনা করছে।
ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের পর সিএনএনকে ইরানের একজন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিস্তৃতি এবং সরাসরি তাদের হত্যা করার হুমকি দিয়েছে। তিনি বলেন, এ কারণে ইরান এখন আমেরিকান অঞ্চল, বাহিনী এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে পর্যালোচনা করবে। যেগুলো এখনও ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করে হামলা চালানো হবে।
হামলার ভয়ে সারারাত বাঙ্কারে লাখো ইসরাইলী
ইরানের পক্ষ থেকে একের পর এক ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার মুখে লাখ লাখ ইসরাইলী নাগরিককে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে।
গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ইসরাইল অভিমুখে ইরান অন্তত পাঁচটি ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ করেছে। এ ধারাবাহিক হামলার ফলে পুরো রাত জুড়ে লাখ লাখ মানুষ বোম্ব শেল্টারে অবস্থান নিতে বাধ্য হন।
ইসরাইলী বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিশেষ কৌশল বা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মিসাইল ছোড়ার প্রধান উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষকে দীর্ঘক্ষণ আশ্রয়ে বন্দী রেখে ইসরাইল সরকারের ওপর মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেনাবাহিনী আগেই আভাস দিয়েছিল যে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে ইরান থেকে অন্তত ১,০০০ মিসাইল হামলা হতে পারে। তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ২০০টি মিসাইল ছোড়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের এই সংখ্যার ব্যবধানকে ইসরাইলী পক্ষ থেকে ইরানের সামরিক দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, ইসরাইলী বাহিনীর ধারাবাহিক ‘অপারেশনাল সাকসেস’ বা সফল সামরিক অভিযানের কারণেই ইরান তার সক্ষমতা অনুযায়ী বড় আকারের হামলা চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে হামলার এই আতঙ্ক ইসরাইলের জনজীবনে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি করেছে।
ইরানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে ইউরোপীয়রা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার বিরুদ্ধে ইউরোপের জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ইউরোপের প্রধান চার দেশ স্পেন, ইতালি, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যে পরিচালিত সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, এই দেশগুলোর অধিকাংশ মানুষই এই সামরিক হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী।
শুক্রবার প্রকাশিত এসব জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ সরাসরি যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের সরকারকে নিরপেক্ষ থাকার বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছে।
স্পেনে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬৮ শতাংশ নাগরিক এই হামলার বিপক্ষে। দেশটির অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মনে করেন, স্পেন সরকারের উচিত নয় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলকে কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া। এমনকি স্পেনের ভূখণ্ডে থাকা সামরিক ঘাঁটিগুলো এই যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করতে দেওয়ার বিপক্ষেও মত দিয়েছেন অধিকাংশ স্প্যানিশ নাগরিক। ইতালিতেও চিত্রটি প্রায় একই রকম। সেখানে ৫৬ শতাংশ মানুষ এই হামলার বিরোধিতা করেছেন। ইতালির সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ মনে করে, সরকারের উচিত কোনো পক্ষ না নিয়ে সরাসরি যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা।
এদিকে জার্মানিতে পরিচালিত এক জরিপ বলছে, সেদেশের ৫৮ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধকে অন্যায্য বলে মনে করছেন। গত ২০ বছরের মধ্যে বর্তমান সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জার্মানির সাধারণ মানুষের আস্থা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ জার্মান নাগরিক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই সংঘাত খুব শীঘ্রই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। তারা মনে করছেন, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এখন নীতি-নৈতিকতার চেয়ে শক্তির দাপট বা পেশিশক্তির মাধ্যমেই বেশি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যেও এই হামলার প্রতি জনসমর্থন অত্যন্ত সীমিত। ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রায় অর্ধেকই এই অভিযানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে ব্রিটিশ বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানোর বিষয়টিকে দেশটির সাধারণ মানুষ সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই পরিস্থিতি যেভাবে মোকাবিলা করছেন, তা নিয়ে সেদেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরাইলী যৌথ বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং দেড় শতাধিক স্কুলছাত্রীসহ সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের থাড রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে ইরান। ৩০ কোটি ডলার মূল্যের এই রাডারটি ধ্বংস হওয়ায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিগুলো দেখাচ্ছে, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি আরটিএক্স করপোরেশনের রাডার এবং এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে। পরে একজন মার্কিন কর্মকর্তাও ‘থাড’এর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, জর্ডানে ইরানের দুটি হামলার খবর পাওয়া গেছে। একটি ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং অন্যটি ৩ মার্চ। দুটি হামলাই প্রতিহত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি কেন্দ্রের উপপরিচালক রায়ান ব্রবস্ট বলেন, ‘যদি ধ্বংসের বিষয়টি সত্যি হয়ে থাকে, তবে থাড রাডারের ওপর এই হামলা হবে ইরানের অন্যতম সফল আক্রমণ।’ তবে ব্রবস্ট আরও যোগ করেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের কাছে আরও রাডার রয়েছে, যা আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষা দিতে পারে। ফলে একক কোনো রাডার হারালে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
মার্কিন ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’–এর (থাড) কাজ হলো বায়ুমণ্ডলের একেবারে শেষ সীমানায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা। এর মাধ্যমে তারা প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও জটিল হুমকি মোকাবিলা করতে পারে। বর্তমানে এই ‘এন/টিপিওয়াই–২’ রাডারটি অকেজো হয়ে যাওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর দায়িত্ব পড়বে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ওপর। এটির ‘পিএসি-৩’ ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ইতিমধ্যেই অনেক কমে গেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়া, গুয়ামসহ সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আটটি থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি ব্যবস্থার দাম প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যার মধ্যে শুধু রাডারটির দামই ৩০ কোটি ডলার।
সিএসআইএস-এর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ টম কারাকো বলেন, ‘এগুলো অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য কৌশলগত সম্পদ এবং এটি হারানো এক বিরাট ধাক্কা।’ টমক কারাকো আরও বলেন, ২০১২ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর নয়টি থাড ব্যাটারি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র আটটি। তাই হাতের কাছে বাড়তি কোনো ‘টিপিওয়াই–২’ রাডার নেই।
প্রতিটি ‘থাড’ প্রতিরক্ষা ব্যাটারিতে ৯০ জন সেনা, ট্রাকে বসানো ছয়টি লঞ্চার, ৪৮টি ইন্টারসেপ্টর (প্রতি লঞ্চারে ৮টি), একটি টিপিওয়াই–২ রাডার এবং একটি ফায়ার কন্ট্রোল ও যোগাযোগ ইউনিট থাকে। লকহিড মার্টিন করপোরেশনের তৈরি প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
প্যাসিফিক ফোরাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো উইলিয়াম অ্যালবার্ক বলেন, ‘আপনি যদি সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চান, তাহলে এটি এমন একটি সরঞ্জাম, যা আপনাকে অবশ্যই যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন রাখতে হবে।’
ক্যালিফোর্নিয়ার জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন–প্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষণা অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুর দিকে কাতারে মোতায়েন ‘এএন/এফপিএস-১৩২’ রাডারও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। থাড সিস্টেমের মতো এটি স্থানান্তরযোগ্য নয়, বরং একটি স্থায়ী স্থাপনা। এই রাডারটি মূলত অনেক দূর থেকে আগত হুমকি শনাক্ত করতে স্থাপন করা হয়েছে। তবে এটি নিশানায় নিখুঁতভাবে অস্ত্র নিক্ষেপের জন্য উপযুক্ত নয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টা হামলায় চাপের মুখে রয়েছে। ফলে মাঝেমধ্যে চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে থাড এবং প্যাট্রিয়টের (পিএসি–৩) মতো উন্নত ইন্টারসেপ্টরগুলোর মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে লকহিড ও আরটিএক্স-এর মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এক বৈঠকে বসেছে। পেন্টাগন এখন তাদের অস্ত্রের উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে চাপ দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের ড্রোন হামলা
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে ‘প্রিমা’ নামে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। শনিবার সকালে এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে নৌ-চলাচল নিষিদ্ধ এবং এই জলপথটি অনিরাপদ। আইআরজিসি নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও ওই ট্যাংকারটি তা উপেক্ষা করে চলাচল করছিল। নৌবাহিনীর নির্দেশনা অমান্য করায় ‘অপরাধী’ ওই ট্যাংকারটির ওপর ড্রোন হামলা চালা নো হয়। জাহাজ চলাচলের তথ্য প্রদানকারী ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিক-এর তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ‘প্রিমা’ জাহাজটি অপরিশোধিত তেল ও রাসায়নিক পণ্য পরিবহনকারী একটি ট্যাংকার। এটি ইউরোপীয় দেশ মাল্টার পতাকাবাহী হিসেবে নিবন্ধিত। ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক জলপথে পরিণত হয়েছে। তেহরান আগেই ঘোষণা করেছিল যে তারা এই পথে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্রদের কোনও জাহাজ চলাচল করতে দেবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বৃহস্পতিবার মোতায়েন-পূর্ব প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ইউএস নেভাল ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রণতরি এবং এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজ ও এয়ার উইং তাদের কম্পোজিট ইউনিট ট্রেনিং এক্সারসাইজ শেষ করেছে, যা যেকোনও জাতীয় মিশনে যাওয়ার আগে মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। বলছে, এই ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপটি খুব শিগগিরই মোতায়েন করা হবে এবং এটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দিকে রওনা দেবে। সেখানে সম্প্রতি বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড অবস্থান করছিল।
এদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বৃহস্পতিবার সুয়েজ খাল অতিক্রম করেছে এবং বর্তমানে এটি লোহিত সাগরে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত রাখতে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন আগে থেকেই আরব সাগরে মোতায়েন রয়েছে।
আমিরাত কুয়েত ইসরাইলে হামলা চালিয়েছে ইরান
ইসরাইলসহ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী। আঞ্চলিক যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়ে যাওয়ায় শনিবার ইরানের সেনাবাহিনী এই হামলার দাবি করেছে। ইরানের সেনাবাহিনীর বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইরনা বলেছে, ‘‘মার্কিন ঘাঁটি এবং অধিকৃত ভূখণ্ডগুলোতে (ইসরাইল) বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানি নৌবাহিনী।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শনিবারের এই হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-মিনহাদ ঘাঁটি, কুয়েতের একটি ঘাঁটি এবং ইসরাইলের একটি কৌশলগত স্থাপনাকে নিশানা করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, এই হামলায় মার্কিন সন্ত্রাসীদের আকাশযুদ্ধ কেন্দ্র, স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র, আর্লি ওয়ার্নিং রাডার এবং ফায়ার কন্ট্রোল রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকেই ইসরাইল এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরান।
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনীর জন্য ‘অপেক্ষায়’ আইআরজিসি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ পারাপারে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাহারার অপেক্ষায় রয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বর্তমানে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় শনিবার আইআরজিসি মার্কিন বাহিনীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এই জলপথে মার্কিন বাহিনীকে ধ্বংস করে দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে আইআরজিসি। এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ঘোষণা দেন, যথাযথ সময়েই নৌবাহিনী এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে পাহারা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন মন্ত্রীর এই ঘোষণার পর ইরানের বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি বলেন, ‘‘আমরা তাদের উপস্থিতির অপেক্ষায় আছি।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমরা পরামর্শ দিচ্ছি, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মার্কিনিরা যেন ১৯৮৭ সালে তাদের সুপারট্যাঙ্কার ‘ব্রিজেটনে’ লাগা আগুন এবং সম্প্রতি লক্ষ্যবস্তু হওয়া তেলবাহী জাহাজগুলোর কথা মনে রাখে।’’
দুবাই বিমানবন্দরে আংশিকভাবে বিমান চলাচল শুরু
ইরানে চলমান হামলার প্রেক্ষাপটে সাময়িক স্থগিত থাকার পর দুবাই বিমানবন্দর তাদের কার্যক্রম আংশিকভাবে পুনরায় চালু করেছে। আন্তর্জাতিক যাতায়াতের জন্য বিশ্বের ব্যস্ততম এই বিমানবন্দরটি শনিবার (৭ মার্চ) এক ঘোষণায় জানায়, দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এবং দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল থেকে সীমিত পরিসরে কিছু ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। এর আগে ওই এলাকায় আকাশপথে হামলার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে সব ধরণের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা জারি করে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা বা এয়ারলাইনস থেকে ফ্লাইটের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত কোনো যাত্রীরই বিমানবন্দরে আসা উচিত নয়। পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইটের সময়সূচী ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই নিশ্চিত কনফার্মেশন ছাড়া যাতায়াত না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। মূলত ইরান থেকে ধেয়ে আসা হামলার সময় আকাশসীমায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তা ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এই সাময়িক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।
প্রতিবেশী দেশ থেকে হামলা না হলে আর আক্রমণ করবে না ইরান’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আগে হামলা না হলে তাদের লক্ষ্য করে আর কোনো আক্রমণ চালাবে না ইরান। গত শুক্রবার ইরানের অন্তর্র্বতীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ এ নীতির অনুমোদন দিয়েছে বলে জানান তিনি।
ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক মন্তব্যে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সাম্প্রতিক কয়েক দিনে সংঘটিত হামলার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশও করেন। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশীদের লক্ষ্য করে হামলা করতে হচ্ছে বলে আমরা দুঃখিত। তবে তাদের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি আমাদের কোনো শত্রুতা নেই।’ অন্যদিকে ইসরাইল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা ইরানি সরকারের অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও একটি সমন্বিত হামলা চালিয়েছে।
আইডিএফের তথ্যমতে, অভিযানে ইসরাইয়েলি বিমান বাহিনীর ৮০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এবং প্রায় ২৩০টি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। ইসরাইলের দাবি, হামলায় বেশ কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সামরিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইমাম হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে আইআরজিসি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
ইরানে ক্রমবর্ধমান সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ানোর পর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এই সংঘাত কখন এবং কীভাবে শেষ হবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তীব্র হচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি কেবল তেহরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ মেনে নেবেন। একই সময়ে ইসরাইল ইরান ও লেবাননে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা শুরু করেছে। শুক্রবার প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্য সাময়িকভাবে কূটনৈতিক সমাধানের আশা জাগালেও পরে ট্রাম্পের মন্তব্যে সেই সম্ভাবনা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।