জাতীয় ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর) স্থগিত করা এবং গ্রেফতার ব্যবসায়ীদের মুক্তিসহ কয়েকটি দাবিতে আন্দোলনরত মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। গ্রে মার্কেটের মোবাইল ব্যবসায়ীরা গতকাল রোববার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর ব্যস্ত এলাকা কাওরানবাজারের সোনারগাঁও ইন্টার সেকশন অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে, টিয়ারশেল, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড সরিয়ে দেয়। এ সময় গোটা এলাকা রণক্ষেত্রের রুপ নেয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার ফজলুল করিম বলেন, আমরা সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছি। এ সময় সেখান থেকে কয়েকজনকে পুলিশের প্রিজন ভ্যানে তুলে নিতে দেখা যায়। কিছু সময়ের জন্য কারওয়ান বাজার মোড় হয়ে যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হয়। পরে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বসুন্ধরা শপিংমলের সামনে অবস্থান নেন, আরেকটি অংশ হাতির পুলে মোতালেব প্লাজার দিকে চলে যান।

এখানে মূলত বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স ও হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজার মোবাইল ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করছিলেন। ধাওয়া খেয়ে বিক্ষোভকারীদের একাংশ বসুন্ধরা মার্কেটে ঢুকে পড়ে। আরেক অংশ যায় হাতিরপুলের দিকে। বেলা ২টার দিকে মোতালেব প্লাজার দিক থেকে আবারও সংগঠিত হয়ে ব্যবসায়ীরা সোনারগাঁও ক্রসিংয়ের দিকে আসতে থাকলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বেলা পৌনে ৪টায় ব্যবসায়ীদের মোতালেব প্লাজার সামনে অবস্থান নেয়।

পুলিশের রমনা বিভাগের এডিসি শওকত হোসেন বলেন, মোবাইল ব্যবসায়ীরা হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজার সামনে জড়ো হয়ে সামনে এগোনোর পর তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তারা মোতালেব প্লাজার সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। বেলা ২টার দিকে মোতালেব প্লাজার দিক থেকে আবারও সংগঠিত হয়ে ব্যবসায়ীরা সোনারগাঁও ক্রসিংয়ের দিকে আসতে থাকলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকালেও ব্যবসায়ীদের মোতালেব প্লাজার সামনে অবস্থান নিয়ে থাকতে দেখা যায় বলে স্থানীয় সুত্রগুলো জানায়।

গত ১ জানুয়ারি এনইআইআর পদ্ধতি চালু হওয়ার পর ওই দিনই মোবাইল ব্যবসায়ীরা বিটিআরসি কার্যালয় হামলা চালায়। সেই ঘটনায় ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যবসায়ীদের মুক্তির দাবিতে গতকাল রোববার তারা সোনারগাঁ ক্রসিং অবরোধ করেন। এনইআইআর বাস্তবায়ন আরও তিন মাস পিছিয়ে দেওয়া, পুরনো ফোন আমদানির সুযোগ দেওয়া এবং মোবাইলের আমদানি শুল্ক আরো কমানোর দাবি জানান তারা।

তবে প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ তৈয়্যব বলেছেন, আমরা কাউকে অপরাধ, প্রতারণা করার লাইসেন্স দিতে পারি না। আমরা মোবাইল ফোনের শুল্ক কমিয়েছি, ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছি, তবুও যদি কেউ এরকম করে, তাহলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সরকার পদক্ষেপ নেবে। হামলায় ভাঙচুর হওয়া বিটিআরসি ভবন পরিদর্শনে গিয়ে গতকাল রোববার তিনি এ কথা বলেন।

এনইআইআর পদ্ধতির বিরোধিতা করে গত কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ করছিলেন দেশের আনঅফিসিয়াল মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবসায়ীরা। যারা নানা অবৈধ রুটে কর ফাঁকি দিয়ে নিম্নমানের, ক্লোনড, রিফারবিশড ও পুরনো ফোন দেশের বাজারে ঢোকাচ্ছেন বলে সরকারের অভিযোগ। কর ফাঁকি বন্ধের পাশাপাশি নিম্নমানের ফোন দেশে ঢোকা বন্ধ করতে সরকার এ পদ্ধতি কার্যকরের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

এনইআইআর চালু হলে দেশে অবৈধ পথে আসা ফোনগুলো আর ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাবে অবৈধভাবে বিদেশ থেকে নিয়ে আসা পুরনো ফোনের ব্যবসাও। মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের এই বাধ্যবাধকতা কার্যকর হওয়ার পর কেবল সরকার অনুমোদিত বৈধ হ্যান্ডসেটই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে পারবে। তবে এনইআইআর চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত নেটওয়ার্কে ব্যবহার হওয়া কোনো ফোনই বন্ধ হবে না।

৪ ঘণ্টা পর স্বাভাবিক কারওয়ান বাজার, যান চলাচল শুরু

অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের পর কারওয়ান বাজারে রাস্তা ছেড়েছেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। এর আগে তারা সকাল সাড়ে ১০টার পর কারওয়ান বাজার সড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। এরপর থেকেই মূলত পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে সরাতে অভিযান শুরু করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় র‌্যাব ও সেনাবাহিনী। দফায় দফায় সংঘর্ষের পর দুপুর ২টার পর রাস্তা ছেড়ে যান ব্যবসায়ীরা।

মোবাইল ব্যবসায়ীদের সংগঠন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি) এর পূর্ব ঘোষনা অনুযায়ী গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারা মোড় অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা। তারা সড়কে বসে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এতে বসুন্ধরা থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ প্রথম দফায় লাঠিচার্জ করে ব্যবসায়ীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এরপর দুপুর ১২টার দিকে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ আবার সড়কে এসে বসে পড়েন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। পরে ফের লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। পরে ব্যবসায়ীদের আশপাশের শপিংমলের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। পরে দেড়টার দিকে আবারও ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে এলে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ শুরু করে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। মোবাইল ব্যবসায়ীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকেন। উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশি অভিযানে টিকতে না পেরে ব্যবসায়ীরা রাস্তা ছেড়ে চলে যান। এরপর দুপুর আড়াইটার পর সড়কে যান চলাচল শুরু হয়।

এদিকে দীর্ঘসময় গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। বন্ধ থাকার জেরে রাজধানীর অন্যান্য সড়কেও এর প্রভাব পড়ে। রামপুরা, মহাখালী, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

বিকাল ৩টার দিকে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় ব্যবসায়ীরা তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। ডিসি মাসুদ আলম তাদের কথা শুনে দাবি-দাওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানাবেন বলে আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন, এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন খারাপ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আপনাদের ভেতরে ঢুকে কেউ যেন সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। আপনাদের বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলবো। তারা সমাধানের চেষ্টা করবেন।

চার ঘণ্টা পর সড়ক ছাড়লেন তেজগাঁওয়ের শিক্ষার্থীরা

তেজগাঁও কলেজ ছাত্রাবাসে দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় ফার্মগেইটে অবরোধ করা সতীর্থরা প্রায় চার ঘণ্টা পর সড়ক ছেড়েছেন। গতকাল রোববার বেলা ২টার পর শিক্ষার্থীরা সরে গেলে সড়কে যান চলাচল শুরু হয় বলে তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা জানিয়েছেন। এর আগে সকাল সোয়া ১০ টার দিকে শিক্ষার্থীরা ফার্মগেইট মোড়ে অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।