অনিয়ন্ত্রিত, অপরিকল্পিত ও অপরিণামদর্শী নগরায়ন রোধ না করতে পারলে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগ থেকে রক্ষা করবার কার্যকর কোন উপায় নেই বলে মন্তব্য করেছেন নগরবিদরা। গতকাল শুক্রবার ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) কর্তৃক আয়োজিত সমসাময়িক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন বিশ্লেষণ বিষয়ক “ভূমিকম্প, অগ্নিকান্ডে বিপর্যস্ত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ঢাকার পরিকল্পনাগত সংকট ও করণীয়” শীর্ষক অনুষ্ঠানে তারা একথা বলেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ভূমিকম্প, অগ্নিকান্ডসহ নানা দুর্যোগের কারণে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর ঢাকা অনিরাপদ ও অবাসযোগ্য। শহরের পরিকল্পনাকে সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে অগ্রাহ্য করে নগরায়ন হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন। পাশাপাশি ঢাকামুখী জনস্রোতকে ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে। ভবন নির্মাণ ও আবাসন প্রকল্পগুলোতে বিল্ডিং কোড ও বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের অভাব রয়েছে। জলাশয়, জলাভূমি, প্লাবনভূমির উপর ভরাট করা দূর্বল মাটির উপর নির্বিচারে অনিরাপদ বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব, ভূমি মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা ও লোভ এবং সরকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দূর্নীতি ও দায়িত্বে গাফিলতির কারণে ঢাকার নগর এলাকায় জীবন এখন মারাত্মকভাবে অনিরাপদ।

বক্তারা আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্প ও শহরের বাসযোগ্যতা বিবেচনায় না নিয়েই ব্যবসায়ীদের চাপে ড্যাপ পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই সকল পরিবর্তনে বিবেচনায় নেয়া হয়নি মাটির ভূতাত্ত্বিক গঠন, মাটির ভার বহন ক্ষমতা ও ঢাকার সিসমিক মাইক্রোজোনেশন ম্যাপ। ফলে ঢাকাকে বাঁচাতে ড্যাপ পরিবর্তন এর মাধ্যমে অযাচিতভাবে এফএআর ও জনঘনত্ব পরিবর্তন করতে গ্যাজেট প্রকাশের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। মাটির ভূতাত্ত্বিক গঠন, ভূমির শ্রেণিবিন্যাস ও শহরের ভারবহন ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে শহরের বিশদ পরিকল্পনা করতে হবে। বিএনবিসি কার্যকর করতে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ) অতি দ্রুত গঠন করতে হবে।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকাকে টেকসই ও নিরাপদ করতে হলে ভূমি ব্যবহার জোনিং, বিল্ডিং কোড, মাটির ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা, কাঠামোগত মূল্যায়ন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কমিউনিটির প্রস্তুতি সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। নয়তো বড় ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ড বা বড় দুর্যোগে রাজধানীর ওপর বিপর্যয় নেমে আনতে পারে।

মূল প্রবন্ধের সুপারিশে আইপিডির পক্ষ থেকে অধ্যাপক আদিল বলেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য জরুরি কঠোরভাবে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড ও নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ) গঠন করে দ্রুত বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সিসমিক মাইক্রো জোনেশন ম্যাপ অনুযায়ী নগরায়ন করতে হবে। জলাধার, জলাভূমি ভরাট করে কোনো সরকারি-বেসরকারি উন্নয়নই অনুমোদন করা যাবে না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবেলায় কমিউনিটিকে প্রস্তুত করতে প্রশিক্ষণ, ড্রিল ও গণসচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। স্বল্প আয়ের লোকদের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন এর জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। ভবন সংশ্লিষ্ট অনিয়মে যুক্ত কর্মকর্তা, সংস্থা বা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি কার্যকর করতে হবে।

আইপিডি আরও বলেছে, এখনই ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন এর বিকেন্দ্রীকরণ এর মাধ্যমে বিভাগীয় ও জেলা শহরে পরিকল্পিত নগরায়ণ, নিরাপদ আবাসন, পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা এবং কর্মসংস্থানের সমান্তরাল নীতি নেওয়া যায়– তাহলে আগামী ১৫-২০ বছরে আমরা ঢাকাকে কিছুটা চাপমুক্ত করতে পারব।

আইপিডি উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, চিলি-হাইতি-তুরস্কের ভূমিকম্পের উদাহরণগুলোই আমাদের স্পষ্ট দেখিয়ে দেয় ভূমিকম্প থেকে বাঁচতে বিল্ডিং কোড অনুসরণ এর গুরুত্ব কতটুকু। আমাদের যে কোন ভবন কিংবা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে দূর্যোগ ঝুঁকি কমানোর বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। ইমারত নির্মাণে সকল পর্যায়ে দূর্নীতি মুক্ত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, ঠিক তেমনি ভবন মালিক ও পেশাজীবিদেরকেও দায়বদ্ধ করতে হবে আমাদের।

বিআইপির সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন বলেন, ঢাকা চট্টগ্রাম করিডোরে যেভাবে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বেড়েছে, দেশের অন্য এলাকায় সেভাবে বাড়ছে না। ঢাকার উপর চাপ কমাতে দেশের স্থানিক পরিকল্পনা তৈরি করে দেশের অন্য অঞ্চলগুলোতে উন্নয়ন ছড়িয়ে দিতে হবে। মুনাফাকেন্দ্রিক নগরায়ন মডেল থেকে রাষ্ট্রকে বের হয়ে আসতে হবে।

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, ঢাকাতে জনস্রোত না থামার অন্যতম কারণ অধিকাংশ বিভাগীয়, জেলা শহর ও প্রান্তিক জনপদে যথেষ্ট কর্ম ও মৌলিক চাহিদা পূরণের অপ্রতুলতা। জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ ঢাকাকে শুরু থেকেই বিকেন্দ্রীকরণ ও টেকসই উন্নয়নের ভিতর দিয়ে নিয়ে গেলে আজ তা মৃত্যুকূপে পরিণত হতোনা। জলাশয় ভরাট করে নির্মিত উত্তরা দিয়াবাড়ি ৩য় প্রকল্পে মাইলস্টোন স্কুলের বিমান দুর্ঘটনা তারই সাক্ষ্য দেয়। ঢাকা যদি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় তার দায় যতটা নাগরিকের, তার ঠিক ততখানি সরকারেরও।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, ঢাকায় হোটেল রেস্তোরাঁসহ বাণিজ্যিক এলাকা নির্ধারণে জোনিং যথাযথ অনুসরণ করা হয় না। ফলে অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্প ঝুঁকি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি বলেন, ঢাকার জন্য বিস্তারিত সিসমিক জোনিং ও ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট চিহ্নিত করা জরুরি। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম গড়ে তোলা উচিত।