রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলী করে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামী করে তেজগাঁও থানায় মামলা করেছেন তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মামলাটি দায়ের হয় বলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন।
আজিজুর রহমান মুছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম-সম্পাদকও ছিলেন একসময়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে তিনি কারাগারে গেছেন। বুধবার রাত ৮টার কিছু পরে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতে হোটেল সুপারস্টারের পাশে আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলিতে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীরা তাকে গুলী করে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা তেজগাঁও থানার ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারি মাসুদও গুলীবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা দুজনকে উদ্ধার করে বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, বুধবার রাতে কাওরানবাজারের সুপারস্টার হোটেলের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিনের মত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেন মুছাব্বির। আড্ডা শেষে ৮টা ১০ মিনিটে মাসুদকে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। তারা ৮টা ২০ মিনিটে তেজতুরী বাজারে আহসানউল্লাহ ইন্সটিটিউটের সামনে পাঁকা রাস্তায় পৌঁছালে ওঁৎ পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জন তাদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলী করতে থাকে। তাতে মুছাব্বিরের ডান হাতের কনুই, পেটের ডান পাশে গুলী লাগে। রক্তাক্ত জখম নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বাঁচাতে সুফিয়ান বেপারী মাসুদ এগিয়ে গেলে তাকেও পেটের বাঁ পাশে গুলী করে হামলাকারীরা। মাসুদও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা তাদের মৃত ভেবে গুলী করতে করতে পালিয়ে যায়।
বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসকরা মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করার পর তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে পাঠানো হয়। মাসুদকেও বিআরবি হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। তিনি এখন শঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন মুছাব্বির বলছেন স্ত্রী
মুছাব্বির বেশ কিছুদিন ধরে জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। গতকাল তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, মুছাব্বিরের স্ত্রী মামলা করতে এসে আমাদের বলেছেন বেশ কিছুদিন ধরেই তার স্বামী জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন।
তবে কারা কেন এই হুমকি দিয়েছে সে ব্যাপারটি সুরাইয়া বেগম পুলিশের কাছে স্পষ্ট করেননি বলে জানান উপ-কমিশনার ইবনে মিজান। তিনি বলেন, হুমকির বিষয়ে মুছাব্বিরের পক্ষ থেকে পুলিশকে আগে কখনো অবহিত করা হয়নি।
হত্যাকাণ্ডের পেছনের যে বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ
এদিকে পুলিশ ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুইজনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। সেখানে একজনের চেহারা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপ-কমিশনার ইবনে মিজান। তিনি বলেন, তাকে শনাক্ত করতে পারলেই হত্যার তদন্তে অনেকটা অগ্রগতি হবে। ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে থানা পুলিশ ছাড়াও গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব সমন্বয় করে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। মুছাব্বির হত্যার ঘটনার পেছনে কারওয়ান বাজারে ব্যবসায়ীদের উপর হামলার ঘটনার যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ।
গত বছর ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে।
হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের উপর হামলার অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের এলাকায় আধিপত্যটা কমে গেলে মুছাব্বির সেই জায়গা নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে এলাকায় বেশ উত্তেজনা চলছিল। এছাড়াও ফার্মগেইট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখল নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলে আসছে। এই গ্যারেজ দখল ঘটনায় মুছাব্বিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে পুলিশ। এসব কারণেই মুছাব্বিরের স্ত্রীর স্বামীর জীবননাশের হুমকির অভিযোগের মিল আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন। তবে এর পাশাপাশি হত্যার পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ আছে কি না তাও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
পুলিশ জানায়, মুছাব্বিরকে গুলী করে হত্যার পর দুই দুর্বৃত্তকে দৌড়ে পালাতে দেখা গেছে। হত্যাকারীরা ঘটনার আগেই ওই এলাকায় অবস্থান করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার পর আশপাশের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ এখন পর্যন্ত দুজন দুর্বৃত্তকে দৌড়ে পালাতে দেখেছে। আরও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম বলেন, নিহত মোস্তাফিজুর রহমান ওই এলাকায় বসবাস করতেন না। তিনি অন্য এলাকায় থাকতেন। তাঁর স্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি মাঝেমধ্যে তেজতুরী বাজার এলাকায় যেতেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁর বাসার ঠিকানা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
খুনিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা না হলে কঠোর কর্মসূচি: স্বেচ্ছাসেবক দল
মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল। গতকাল দুপুরে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুছাব্বিরের জানাজার আগে স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইয়াসীন আলী ও সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এ হুঁশিয়ারি দিয়ে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
রবিন বলেন, মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছি। এই দাবিতে কাল শনিবার ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে মহানগর ও জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করছি। এর মধ্যে মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে স্বেচ্ছাসেবক দল কঠোর কর্মসূচি দেবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিনের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন মুছাব্বিরেরে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে বলব, আপনারা মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করুন নইলে আমরা খুঁজে বের করব। এই হত্যা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।