২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর বাংলাদেশের কূটনীতিতে এখন বইছে পরিবর্তনের নতুন হাওয়া। জুলাই বিপ্লবের সময় গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আমূল বদলে গেছে আঞ্চলিক সম্পর্কের মানচিত্রও। চলতি বছরে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কে আরও নতুন গতি পাবে এটাই বুঝা যাচ্ছে। বিপরীতে গত এক বছরে ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক এখন তলানিতে ঠেকেছে। এ ছাড়া চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। ভারতের সাথে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, মাদক চোরাচালান বন্ধ, তিস্তা চুক্তি, অসম বাণিজ্য ইস্যুর কোনো সুরাহাও হয়নি। এ ছাড়া গত এক বছর ভারতের ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশিদের ভারত ভ্রমণ কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের ভারতমুখী ধারার অবসান ঘটিয়ে ঢাকা এখন তার প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বয়ান লিখছে। তবে, এই অগ্রযাত্রায় একদিকে যেমন দিল্লীর সঙ্গে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন কূটনৈতিক শীতলতা ও টানাপোড়েন, অন্যদিকে ইসলামাবাদের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ দেড় যুগের স্থবিরতা ভাঙার নতুন সম্ভাবনা। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। আলাপে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গতকাল রোববার তৌহিদ-দারের টেলিফোন আলাপের তথ্য জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। দুই নেতা পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক পর্যালোচনা করেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়েও মতবিনিময় করেছে এবং এই গতিশীলতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একধরণের অস্বস্তির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। যদিও গত ১৬ মাসে উভয়পক্ষ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এক্ষেত্রে বরাবরই প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান। এছাড়া, সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি এবং ময়মনসিংহে পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ঢাকা-ইসলামাবাদের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়: ৫ আগস্টের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে গতির সঞ্চার হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ১৬ মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছেন। এছাড়া, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের মধ্যেও কয়েক দফা বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকটি সফর বিনিময় হয়েছে। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার গত বছরের ২৩-২৫ আগস্ট ঢাকা সফর করেন। প্রায় ১৩ বছর পর পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটি ছিল প্রথম ঢাকা সফর। এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন করে সক্রিয় করা। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান গত ২১-২৪ আগস্ট ঢাকা সফর করেন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভাপতি ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান মহসিন রাজা নকভি গত ২২-২৩ জুলাই ঢাকা সফর করেন। ২৬ অক্টোবর ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক। এ ছাড়া পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালুচ গত ১৬-১৭ এপ্রিল ঢাকা সফর করেন। সে সময় তিনি দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী চলতি বছর পাকিস্তান সফর করেন। এ ছাড়া ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন গত ৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানে ১০ দিনের সফরে যান। এসব সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, কেউ কেউ বলেন, আমরা নাকি পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছি। কিন্তু আমরা আদৌ কোনো ঝোঁক নিচ্ছি না। আমরা যা করছি, তা হলো পাকিস্তানের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে আমাদের স্বার্থ রক্ষা পায়।
বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা ও ভাঙচুর এবং হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি; ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক তলানিতে: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিপ্লবে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিভিন্ন ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে টানাপোড়েন চলে আসছিল। তবে চলতি বছর সেই টানাপোড়েন আরও বৃদ্ধি পায়। বছরের শেষে এসে ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ৫ আগস্টের পর থেকেই পলাতক ফ্যাসিস্ট ও বর্তমানে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা, বাণিজ্য বিধিনিষেধ, পুশ-ইন, ভিসা বন্ধ, সীমান্ত হত্যাসহ নানা ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লীর মধ্যে তিক্ততা ও টানাপোড়েন চলে আসছে। চলতি বছর এসব ইস্যুতে টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে নিরাপত্তা ইস্যু। বছরের একেবারে শেষ সময়ে এসে নিরাপত্তা ইস্যু ঘিরে দুই দেশের হাইকমিশনারকে দফায় দফায় তলব ও পাল্টা তলবের ঘটনাও ঘটে।
ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিবাদে দিল্লী ও আগরতলায় ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী তিনটি সংগঠন, যার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতের নয়াদিল্লী, কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা বাংলাদেশ মিশনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে দুই দফা তলব করা হয়। বিপরীতে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকেও তলব করে বাংলাদেশে থাকা ভারতের মিশনগুলোর নিরাপত্তা চাওয়া হয়। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনীতিকদের পাল্টাপাল্টি তলব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে উভয় দেশ দুবার করে পরস্পরের দূতকে তলব করে প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়েছে। সবশেষ ২৩ ডিসেম্বর সকালে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ওই দিন বিকেলেই দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একই দিনে দুই দূতকে পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনা এটিই প্রথম।
এ ছাড়া চলতি বছর ঢাকা-দিল্লির মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কোনো সফর বিনিময় হয়নি। তবে চলতি বছর ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৈঠকে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত হত্যা, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন ইস্যু আলোচনায় তোলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারত সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশটির আচরণ খুব একটা সহযোগিতামূলক ছিল না। বিভিন্ন সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও দুই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য এবং শেখ হাসিনা ইস্যু বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক খুব বেশি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত হয়তো তাদের সঙ্গে নতুন করে পথচলার কৌশল নির্ধারণ করবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে চলছে সেটি সবাই দেখতে পাচ্ছে। সম্পর্ক সবসময় একরকম যায়ও না। তবে, প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক কারও জন্যই সুখকর নয়। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারতের দিক থেকে আরও বেশি আন্তরিকতা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন। সময় খুব কম। নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আমূল পরিবর্তনের সুযোগ কম। তবে, রুটিন কাজগুলো সচল রাখা প্রয়োজন। আর পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকলে তা গ্রহণ করা উচিত। তবে, একই সঙ্গে অমীমাংসিত ঐতিহাসিক ইস্যুগুলো সমাধানের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে।’