জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কারফিউ দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যায় উসকানি দেয়াসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে পরবর্তী শুনানি ৪ জানুয়ারি।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য এই দিন ধার্য করেন। প্যানেলের বাকি দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এর আগে ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এ সময় প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা তাকে সহায়তা করেন।
শুরুতেই চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি করে গণহত্যার যে অভিযোগ, সে বিষয়ে আজ শুনানি হবে এই দুই আসামির। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে একে একে ৫টি অভিযোগ পড়ে শোনান।
এসময় চিফ প্রসিকিউটর জানান, তিনি একটি অডিও শোনাতে চান, যেখানে প্রমাণ করা যাবে ঠিক কি অভিযোগে তাদের বিচার শুরুর আবেদন করেছেন তারা।
অডিও বাজিয়ে শোনানো হলে দেখা যায় সেখানে, সালমান এফ রহমানকে আনিসুল হক আন্দোলন দমনে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দেয়ার কথা বলেন। শুধু তাই নয় কারফিউ দিতে বার বার অনুরোধ করা হচ্ছে বলেও শোনা যায়।
এ সময় নিজেদের ফোনের অডিও শুনে হাসতে থাকেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। নিজেদের মধ্যে কথা বলতেও দেখা যায় তাদের।
পরে চিফ প্রসিকিউটর এই দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আহ্বান জানান। পরে সালমান ও আনিসুলের সেই হাসিমুখ মিলিয়ে যায়।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নির্দেশে ২৮৬টি মিথ্যা মামলায় সাড়ে চার লাখ ছাত্র-জনতাকে আসামি করা হয়েছিল।
সুনির্দিষ্ট পাঁচটি অভিযোগ হলো: প্রথমত চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান ও আনিসুল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯ জুলাই ফোনে কথা বলেন তারা। তাদের কথোপকথনের একপর্যায়ে শোনা যায় ওদের শেষ করে দেওয়ার। অর্থাৎ আজ রাতেই কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দিতে হবে বলে জানান সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
এরই ধারাবাহিকতায় ২২ জুলাই ব্যবসায়ীদের নিয়ে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন সালমান এফ রহমান। ওই বৈঠকে জীবন দিয়ে হলেও হাসিনার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যেই আইনমন্ত্রীর নির্দেশে ২৮৬টি মিথ্যা মামলা করা হয়। যেখানে সাড়ে চার লাখ ছাত্র-জনতাকে আসামি করা হয়েছিল। তাদের এমন ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় প্রাণ দিয়েছেন বহু ছাত্র-জনতা। তবু নির্যাতন বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি তারা।
দ্বিতীয়ত, সালমান-আনিসুলের জ্ঞাতানুসারে ২৩ জুলাই হত্যাকা- ঘটেছে। অর্থাৎ তাদের প্ররোচনা-উসকানিতে মিরপুরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় বাহিনী।
তৃতীয়ত, মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র করেছিলেন এই দুই প্রভাবশালী। তাদের উসকানি ও সহায়তায় ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ এ আক্তারুজ্জামানকে জীবন দিতে হয়। আহত হন আরও অনেকে। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি-প্ররোচনায় ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এ আকাশ, সেতু, আলভীসহ ১২ জনকে হত্যা করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
পাঁচ নম্বরে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে পরিকল্পনা করেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। তাদের নির্দেশে প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের হামলায় মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বরে আল-আমিন, আশরাফুল, সাব্বির, রিতাসহ ১৬ জন হত্যার শিকার হন।
ব্যাপকমাত্রার ও পদ্ধতিগত অপরাধ করেছেন সালমান ও আনিসুল। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগই গঠনের জন্য আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। পরে আসামিপক্ষে শুনানির জন্য সময় চান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। তার আবেদন মঞ্জুর করে সালমান-আনিসুলের পক্ষে শুনানির জন্য আগামী ৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।