নির্বাচন ডেস্ক : ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। রাজপথে ঝরা রক্ত আর শত শত শহীদের আত্মত্যাগের একমাত্র লক্ষ্য ছিলÑএকটি বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ। এই আকাক্সক্ষাকে ধারণ করেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজছে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কারের বিশাল ডালি সাজিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই ইশতেহারগুলো কি জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করতে পেরেছে, নাকি এটি কেবলই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল?
জামায়াতে ইসলামী: ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও নৈতিক সংস্কার
জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে জুলাই বিপ্লবের ছোঁয়া স্পষ্ট। দলটির প্রস্তাবিত সংস্কারের মূল ভিত্তি হলো ‘ইসলামি মূল্যবোধ ও ইনসাফ’।
জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি: জামায়াত তাদের ইশতেহারে জুলাই বিপ্লবকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে অভিহিত করে প্রতিটি শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও পুনর্বাসনের অঙ্গীকার করেছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে একটি স্বাধীন জুডিশিয়াল কমিশন গঠনের কথা বলেছে দলটি।
দুর্নীতি ও নৈতিকতা: জামায়াত বলছে, কেবল আইন দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ সম্ভব নয়; তারা শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছে।
সংখ্যালঘু সুরক্ষা: ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মন্ত্রণালয়’ গঠন এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিয়েছে দলটি, যা জুলাই বিপ্লবের অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের অন্যতম দাবি ছিল।
বিএনপি: ৩১ দফার ‘রেইনবো নেশন’ ও কাঠামোগত সংস্কার
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ‘৩১ দফা’ ইশতেহারের মূল সুর হলো রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তন।
ক্ষমতার ভারসাম্য: বিএনপি বলছে, কোনো ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এটি জুলাই বিপ্লবের অন্যতম দাবি ‘স্বৈরতন্ত্রের অবসান’-এর সরাসরি প্রতিফলন।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: আইনসভাকে আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করতে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি।
সংবিধান সংস্কার: সংবিধানের বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক ধারাগুলো সংশোধনে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তারুণ্যের অগ্রাধিকার: ‘ন্যাশনাল সার্ভিস স্কিম’ এবং ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বিপ্লবের কারিগর তরুণদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
ইশতেহারে সংস্কারের প্রতিফলন থাকলেও বাস্তবায়নের পথ মসৃণ নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে অনেক রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় গিয়ে ইশতেহার ভুলে যাওয়ার উদাহরণ রেখেছে।
চাঁদাবাজি ও দখলবাজি: জুলাই বিপ্লবের পর মাঠ পর্যায়ে দখলবাজির যে চিত্র দেখা গেছে, তা একটি দলের সংস্কারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সংস্কৃতি পরিবর্তন: কেবল কাঠামোগত সংস্কার নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং কর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন না এলে জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে।
ব্যালট পেপারে শহীদের স্বপ্ন-কী
চান ছাত্র প্রতিনিধিরা?
৫ই আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে গেছে। যে তরুণরা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের আকাক্সক্ষা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং একটি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি ও তরুণ ভোটারদের সাথে কথা বলে তাদের প্রধান ৫টি আকাক্সক্ষা চিহ্নিত করা হয়েছে:
ফ্যাসিবাদমুক্ত স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো: ছাত্র প্রতিনিধিরা এমন একটি সাংবিধানিক সুরক্ষা চান, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি বা দল ‘ফ্যাসিস্ট’ হয়ে উঠতে না পারে। তাদের দাবিÑদুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয় এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জুলাই সনদ: প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে জুলাই হত্যাকাণ্ডের হুকুমদাতা ও বাস্তবায়নকারীদের বিচারের স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। এছাড়া, রাজনৈতিক দলগুলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর সংস্কার প্রস্তাবের সাথে কতটুকু একাত্ম, তা তরুণদের কাছে বড় বিচার্য।
মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও কর্মসংস্থান: কোটা সংস্কার থেকে শুরু হওয়া এই বিপ্লবের মূল আকাক্সক্ষাই ছিল মেধার মূল্যায়ন। ছাত্ররা চান কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগের এমন এক স্বচ্ছ পদ্ধতি যেখানে ‘দলীয় প্রভাব’ ও ‘ঘুষ’ ইতিহাসের পাতায় চলে যাবে।
গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কার: ছাত্ররা চান সংবিধানের এমন কিছু মৌলিক সংস্কার যা কেবল সংসদ নয়, বরং সরাসরি ‘গণভোট’-এর মাধ্যমে জনগণের সম্মতিতে চূড়ান্ত হবে। তারা চান নাগরিকের মৌলিক অধিকার যেন কোনো বিশেষ আইনের (যেমন সাইবার আইন) মাধ্যমে হরণ করা না যায়।
ক্যাম্পাস ও এলাকাভিত্তিক দখলদারি মুক্তি: ছাত্র প্রতিনিধিদের সাফ কথাÑআওয়ামী লীগের পতনের পর যদি অন্য কোনো দল ক্যাম্পাস বা এলাকায় ‘চাঁদাবাজি’ ও ‘দখলদারি’ শুরু করে, তবে তা হবে বিপ্লবের সাথে বেইমানি। তারা সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচনী পরিবেশ চান।
ছাত্র প্রতিনিধিদের ভাষ্য: আমরা শুধু ভোট দিতে চাই না, আমরা আমাদের ভোটের মাধ্যমে এমন এক বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে চাই যেখানে আর কোনো ছাত্রকে আবু সাঈদ বা মুগ্ধ হতে হবে না।
অপেক্ষা : ১২ ফেব্রুয়ারি
বিএনপি ও জামায়াতের ইশতেহারে জুলাই বিপ্লবের অনেক দাবি স্থান পেয়েছে। বিএনপি যেখানে ‘কাঠামোগত পরিবর্তন’-এর ওপর জোর দিচ্ছে, জামায়াত সেখানে ‘নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি’ পরিবর্তনের কথা বলছে। ভোটাররা এবার শুধু সুন্দর ইশতেহার নয়, বরং ইশতেহার বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা খুঁজছেন। ১২ই ফেব্রুয়ারির রায়ই বলে দেবেÑজনগণ কোন ধরণের সংস্কারকে গ্রহণ করেছে।