‘আর্থকোয়াক অ্যাওয়ারনেস, সেফটি প্রটোকল অ্যান্ড ইমার্জেন্সি প্রিপিয়ার্ডনেস’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা আশংকা করেছেন, টেকটোনিক প্লেটের ৩ ফল্টে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। সময়মতো সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে বড় ধরনের ভূমিকম্পেও ক্ষতি ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তারা বলেন, বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড আয়োজিত এক সেমিনারে এমন মতামত দিয়েছেন দেশিÑবিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে এসব মত প্রকাশ করা হয়। সেমিনারে দেশি বিদেশি ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ, স্থপতি, প্রকৌশলী, রিয়েল এস্টেট উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগই পারে একটি ভূমিকম্প-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
সেমিনারে বক্তব্য রাখেন প্রকৌশলী প্রফেসর ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া, প্রফেসর ড. সৈয়দ ফখরুল আমিন (বুয়েট), রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদুজ্জামান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী, রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ আল হোসেন চৌধুরী রিজভী, প্রফেসর ড. রাকিব আহসান (বুয়েট), বাজুস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান, বিএমইডির পরিচালক মমিনুল ইসলাম, স্থপতি আরিফুল ইসলাম, স্থপতি রফিক আজম ও ভিস্তারার এমডি মুস্তফা খালিদ পলাশ। সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন জাপানের দুই ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ কেসিরো সাকো এবং হেসাইয়ে সুগিয়ামা। তারা জাপানের ভূমিকম্প-পরবর্তী অভিজ্ঞতা, নিরাপদ অবকাঠামো নকশা এবং আধুনিক টেকসই নির্মাণমান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনগুলোর স্ট্রাকচারাল অডিট, কাজের মান কঠোরভাবে তদারকি, জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের নিয়মিত ড্রিল, সচেতনতা কার্যক্রম এবং পরিবারভিত্তিক জরুরি প্রস্তুতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তারা জানান, ভারত, মিয়ানমার ও ইউরেশীয় এই তিন সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ। সিলেটের ডাউকি ফল্ট, চট্টগ্রাম–টেকনাফের চিটাগং-আরাকান ফল্ট এবং মিয়ানমারের সাগাইং ফল্ট মিলিয়ে দেশটি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, ঘনবসতি, বিল্ডিং কোড উপেক্ষা এবং সংকীর্ণ সড়ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি ঢাকায় অনুভূত একাধিক ভূমিকম্প দেশের ঝুঁকি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং দুর্বল ভবন কাঠামোর কারণে বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটলে বিপর্যয় ভয়াবহ হতে পারে। তাই সচেতনতা, প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র, আবাসন খাত ও জনগণএই তিনটি স্তম্ভ শক্তিশালী হলেই আমরা ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারবো।
সেমিনারে উল্লেখ করা হয়, গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে ২০০টির বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে এবং ২০২৪ সালের পর থেকে কম্পনের হার আরও বেড়েছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় থাকা ‘মেগাথার্স্ট’ ফল্ট থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাবডাকশন জোনে গত ৮০০-১০০০ বছরের সঞ্চিত শক্তি এখনো মুক্ত হয়নিÍযা বিশেষজ্ঞদের মতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক সতর্কসংকেত।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনগুলোর স্ট্রাকচারাল অডিট, কাজের মান কঠোরভাবে তদারকি, জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের নিয়মিত ড্রিল, সচেতনতা কার্যক্রম এবং পরিবারভিত্তিক জরুরি প্রস্তুতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।