ফয়সালসহ সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার লেনদেন
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই বিপ্লবী শরিফ ওসমান হাদীকে গুলী করা শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ দেশের বাইরে চলে গেছেন কি না এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক সময় অপরাধীদের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ‘পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে’ এ কথা বলেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম।
শুটার ফয়সাল করিম সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে জবাবে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ফয়সালের শেষ অবস্থান নিয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এটা পেতে আমাদের বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। তবে সে যে দেশের বাইরে চলে গেছে, এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি। অনেক সময় অপরাধীদের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। হত্যাকা-ে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা এখনো স্পেসিফিক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা পাইনি। তবে আমরা সঠিক তথ্য পেতে চেষ্টা করছি।
ফয়সাল করিম মাসুদের তথ্য সম্পর্কে ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ফয়সাল করিম মাসুদের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। আপনারা (সাংবাদিক) যেমন শুনছেন, আমরাও বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছি। তদন্তের স্বার্থে সবগুলো তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। হত্যাকা-ের মোটিভ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনে হচ্ছে ব্যক্তিগত কোনো শুত্রুতা নয়, রাজনৈতিকভাবে হত্যাকা- সংগঠিত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। ফয়সাল ও আলমগীরকে এখনো গ্রেফতার করতে পারিনি, ফলে সেভাবে এখনো জানা যায়নি। ডিবিপ্রধান বলেন, ওসমান হাদী হত্যাকা-ের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হাদীকে গুলীর পর প্রত্যেক ইউনিটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসামি গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ জনকে বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, অস্ত্র, গুলী ও পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে। শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ছবি আপলোড করেছিল, সেটি ভারত থেকে আপলোড করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। আপনারা ছবিটি ফরেনসিক করেছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্তাধীন বিষয়’। সবগুলো বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজে দেখেছি হাদীর পাশে আসামিরা ছিলেন। তারা কার মাধ্যমে এসেছিলেন। অর্থাৎ মাস্টারমাইন্ড কারা। এসব বিষয় আপনারা তদন্ত করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, এটি বড় তদন্তাধীন বিষয়। তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে।
সিবিয়ন-সঞ্জয় ফের রিমান্ডে: শরিফ ওসমান হাদী হত্যার সন্দেহভাজন হামলাকারীদের সীমান্ত অতিক্রম করে পালাতে সহায়তাকারী সিবিয়ন দিও (৩২) ও সঞ্জয় চিসিমের (২৩) ফের পাঁচদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল রোববার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ এ সংক্রান্ত মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন। হাদী হত্যায় সীমান্ত পারাপারকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সংস্থাটির তদন্তে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে, হত্যাকা-ের পর প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীদের অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে সহায়তা করেছেন সিবিয়ন ও সঞ্জয়।
ডিবির রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ওসমান হাদী হত্যার ঘটনায় পল্টন মডেল থানায় করা মামলায় করা মামলাটি বর্তমানে ডিবির মতিঝিল জোনাল টিম তদন্ত করছে। পুলিশ জানায়, হত্যাকা-ের পর প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যান। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার তথ্য, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং গ্রেফতার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া গেছে। সীমান্ত পারাপারকারী চক্রের হোতা হিসেবে ‘ফিলিপ’ নামের এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। তার অবস্থান শনাক্ত, গ্রেফতার এবং হত্যাকা-ে অর্থদাতা, পরিকল্পনাকারী ও সহায়তাকারীদের শনাক্ত করতে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। শুনানি শেষে আদালত মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে দুই আসামির পাঁচদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে গতকাল রোববার রাতে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব জানিয়েছেন, মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব লেনদেন বিশ্লেষণে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে সিআইডি এই অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। এ ঘটনায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অর্থ পাচার সংক্রান্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে সংস্থাটি। তিনি বলেন, ওসমান হাদি হত্যাকা-ের মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ওরফে রাহুল এখনো গ্রেফতার না হলেও মামলার আলামত গোপন ও অভিযুক্তকে পালাতে সহায়তার অভিযোগে তার পরিবারের সদস্যসহ একাধিক সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতার অভিযানের সময় উদ্ধার বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবইয়ের তথ্য সিআইডি গুরুত্ব নিয়ে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ শুরু করে। এতে দেখা যায়, অভিযুক্ত ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বেশকিছু চেক বইয়ে বিভিন্ন পরিমাণ অর্থের কথা উল্লেখ রয়েছে। চূড়ান্ত লেনদেন সম্পন্ন না হওয়া এসব রেকর্ডের সমষ্টিগত মূল্য প্রায় ২১৮ কোটি টাকা। তবে সিআইডির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযুক্ত এবং তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেন সংঘটিত হয়েছে, যা মানি লন্ডারিং, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংক্রান্ত অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে।
অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু তালেব আরও জানান, বিষয়টি আমলে নিয়ে সিআইডি মানি লন্ডারিং বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে। মূল অভিযুক্ত ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৬৫ লাখ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে দ্রুততম সময়ে যেনো বাজেয়াপ্ত করা যায় সেজন্যও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে সিআইডি।
পাশাপাশি এসব অর্থের মূল সরবরাহকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার জন্য সিআইডির অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকা-ের পেছনে পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহে কোনো সংঘবদ্ধ এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল কি না সে বিষয়েও সিআইডির একাধিক টিম কাজ করছে। অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি মূলহোতাকে গ্রেফতার এবং পুরো অপরাধচক্র উন্মোচনে সিআইডির তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন সিআইডির এই কর্মকর্তা।