পুরোপুরি শীতের মওসুম পৌষ মাস শুরু হতে আর ২ দিন বাকি। এবারে শীতের মওসুমের আগেই আরো ঘনীভূত হচ্ছে গ্যাস সংকট। এরই মধ্যে রাজধানীজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। সকালের নাশতা কিংবা রাতের রান্না কোনো সময়ই মিলছে না পর্যাপ্ত গ্যাস। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে রাজধানীর মানুষ। শুধু তাই নয় গ্যাসের অন্যান্য কোম্পানীগুলোর গ্রাহকরা সমানভাবে গ্যাস সংকটের বিড়ম্বনায় পড়েছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎচালিত হিটার বা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন, এতে খরচও কয়েকগুণ।

পেট্রোবাংলার হিসাব বলছে, দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৩৮০০ থেকে ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সর্বশেষ গত ১২ ডিসেম্বর গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২৬৪৪.৭ মিলিয়ন ঘটফুট। এতে দৈনিক সারা দেশে প্রতিদিন ঘাটতির পরিমাণ ১৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট।’ বিপুল পরিমাণ এই ঘাটতির কারণে চরম ভোগান্তিতে আছেন এখন বাসাবাড়ির মানুষ। শুধু তাই নয় গ্যাস সংকটে শিল্প কারখানার উৎপাদন থমকে আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে. রাজধানীর রায়েরবাগ, মাতুয়াইল, শনি আখড়া, যাত্রাবাড়ি ,আজিমপুর, ডেমরা, স্টাফ কোয়ার্টার, হাজারীবাগ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, আরামবাগ, খিলগাঁও, বাড্ডা, বনশ্রী, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়াও পুরান ঢাকা, শংকর, জিগাতলা, চামেলীবাগ, মালিবাগ, ভূতের গলি, মগবাজারের ভেতরের দিকের এলাকা, ধানমন্ডির কিছু এলাকায় সারা দিন ধরে একেবারেই গ্যাস থাকে না বলে জানিয়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসের চাপ একেবারে কম। শীত বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরো বেড়েছে। দিনে খুব কম সময়ই গ্যাস থাকে। যেটুকু সময় গ্যাস পাওয়া যায় তাতে রান্না করা কষ্টকর। মিটমিট করে জ্বলা চুলায় ভালোভাবে রান্না করাই যেন দায়। চুলায় রান্না বসিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়।

রায়েরবাগ মোহাম্মদ বাগ এলাকার বাসিন্দা ফজলুল হক দৈনিক সংগ্রামকে জানান , প্রতিদিন সকালেই গ্যাস চলে যায়, আসে রাতে। খুব ভোরে উঠে রান্না শেষ করতে হয়। এই গ্যাসের কারণে ছুটির দিনে দুপুরেও মেহমান দাওয়াত দেওয়ার সাহস পাই না। জরুরি দরকারের জন্য এরই মধ্যে ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি।

মাতুয়াইল এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে জানান, শীতকালে গ্যাসের চাপ আগেও কমে যেতো। এখনও সেরকমই পরিস্থিতি। সকালের নাস্তাটা কোনোমতে করা গেলেও দুপুরে এখন আর রান্না করি না। বিকালে রান্না করি। সেটা দিয়েই রাতের খাওয়া হয়, আর যা থাকে সেটাই ওভেনে গরম করে পরের দিন দুপুরের খাবারটা চালিয়ে নিই। ভোগান্তি এখন চরমে গিয়ে ঠেকেছে। সামনে কীভাবে চলবো, কোনো বিকল্প ভেবে পাচ্ছি না।

যাত্রাবাড়ি মিরহাজারিবাগ খালপাড়ের বাসিন্দা মিমি আত্তার দৈনিক সংগ্রামকে জানান , খুব ভোর থেকেই চুলার গ্যাস কমতে শুরু করে। টিমটিম করে জ্বলা আঁচে কোনোমতে রুটি সেঁকে, ডিম ভেজে সকালের নাস্তা খাওয়া গেলেও দুপুরের রান্না আর করা যায় না। এরপর গ্যাসই থাকে না চুলায়। সন্ধ্যার পরও থাকে না। রাত ১১টার পর গ্যাস এলেও তা সামান্য। তা দিয়ে রান্না হয় না।

মিরপুর রাইনখোলা এলাকার বাসিন্দা রেশমা আক্তার দৈনিক সংগ্রামকে জানান,প্রতি মাসে গ্যাসের বিল দেওয়া লাগে। আবার গ্যাস না থাকায় সময়মতো রান্না করতে পারি না। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। ডাবল খরচ বহন করতে হচ্ছে। আমাদের মতো অল্প আয়ের পরিবারের জন্য এটি কষ্টের। ঠিকভাবে গ্যাস পেলে এই অতিরিক্ত খরচ হতো না।

শীত কালে গ্যাস সংকট বেড়ে যাওয়া নিয়ে তিতাস গ্যাস কোম্পানিসহ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর সূত্র জানায়, শীতে দেশে গ্যাসের ঘাটতি তীব্র হয়। পাইপলাইনে কনডেনসেটসহ ময়লা জমে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশে গ্যাসের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়া, ডলার-সংকটে এলএনজি আমদানি করতে না পারা এবং আগের যে কোনো সময়ের চাইতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে দেশে গ্যাসের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি একটি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় এই সংকট আরও বেড়েছে।

জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমাগতভাবে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এখন দেশীয় গ্যাস খনিগুলো থেকে মাত্র ১৭৩৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে এই সরবরাহের পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। গত কয়েক বছর ধরে যা অব্যাহতভাবে কমছে। সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও দেশের খনি থেকে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না।

পেট্রোবাংলা জানায়, ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে ৫০টি ও ২০২৬-২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খনন ওয়ার্কওভার কর্মপরিকল্পনাসহ দেশের বিভিন্ন ব্লকে অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননের কাজ জোরদার করা হয়েছে। তবে পুরোনো কূপে গ্যাস অনুসন্ধান করে গ্যাস পাওয়া গেলেও তা পরিমাণে খুব বেশি আসবে না। অপরদিকে নতুন কূপে গ্যাস পেলে সেটি উত্তোলন করে গ্রিডে আনতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।

তিতাসের একজন কর্মকর্তা জানান, গত বছরের তুলনায় উৎপাদন কমেছে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এই ঘাটতির রেশ তো সব খাতেই পড়বে।’ তিনি বলেন, তিতাসের অধীন এলাকায় গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু আমরা পাচ্ছি ১ হাজার ৫০০ মিলিয়নের মতো। এই গ্যাস আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র, কারখানা, শিল্প, বাণিজ্য, সিএনজি এবং আবাসিকে সরবরাহ করি। এর মধ্যে আবাসিকে ১২ শতাংশের মতো সরবরাহ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় গ্যাস কম পাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে আমরা রেশনিং করতে বাধ্য হই। এ কারণে আবাসিকে গ্যাসের সমস্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। সমস্যার সমাধান কীভাবে এবং কবে নাগাদ হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি যত কম হবে, সরবরাহ ব্যবস্থা তত ভালো হবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, গ্যাস চুরি হচ্ছে, গ্যাস অপচয় হচ্ছে। গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে এলপিজি কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এসব এখন রাষ্ট্রের দর্শন হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তিতাস এগুলো করছে। তিনি আরও বলেন, এগুলো দেখভাল করার দায়িত্ব বিইআরসির, সার্বিকভাবে দেখভাল করার দায়িত্ব পেট্রোবাংলা, মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু তারা কেউ দেখভাল করে না।

দেশের গ্যাস সংকটের জন্য একশ্রেণির রাজনীতিবিদ ও তাদের সহযোগী ব্যবসায়ীদের দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। সম্প্রতি একটি সেমিনারে তিনি বলেছেন, গ্যাস না থাকার কথা জেনেও দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় সংযোগ দেওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেই সক্ষমতা পূরণে প্রয়োজনীয় গ্যাস সংগ্রহের কথা ভাবা হয়নি। বেসরকারি খাতেও অনেক শিল্পকে গ্যাস দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গ্যাস নেই জেনেও লাইন দেওয়া হয়েছে... এগুলো অন্যায়ভাবে, দুর্নীতির মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এর ফলেই আজ আমরা এই সংকটে পড়েছি।

সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের চেষ্টার কথা জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, দুটি উপায়ে চেষ্টা চলছে। একদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে স্থলভাগে বাপেক্সের মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।

বেড়েই চলছে ‘সিস্টেম লস’

পেট্রোবাংলার প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিস্টেম লসের কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যত গ্যাস অপচয় হয়েছে, তা দিয়ে ৩০ লাখ রান্নার চুলায় টানা এক বছর তিন বেলা রান্না করা যেত। গত অর্থবছরে দেশে প্রায় এক হাজার ৭৯৬ মিলিয়ন ঘনমিটার (এমএমসিএম) গ্যাস অপচয় হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে গ্যাসের গড় বিক্রয়মূল্যের হিসেবে, এই অপচয়ের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৪ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘সিস্টেম লস’ বলতে চুরি ও অবৈধ সংযোগ, পুরোনো পাইপলাইনে গ্যাস লিক হওয়া, রক্ষণাবেক্ষণের সময় ক্ষতি, মিটারিং ত্রুটি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় গ্যাসের অপচয়কেই বোঝায়।

শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সিস্টেম লস এত বিশাল পরিমাণের যে, তা দিয়ে প্রায় ২০টি নতুন গ্যাস কূপ খনন করা যেত বা ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুই থেকে তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো সম্ভব হতো। এই সিস্টেম লস কমানোর জন্য কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ২০২১ অর্থবছর থেকে সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই লসের হার বাড়ছেই।

তিতাসের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা শহর এবং নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর ও মুন্সিগঞ্জের মতো এলাকায় হাজারো অবৈধ সংযোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। মনিটরিং দল নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এই সংযোগ কেটে ফেলে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান মিলিতভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৯৬ হাজারের বেশি অবৈধ গৃহস্থালি সংযোগ ও ৫৪১টি অবৈধ শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। এ ছাড়া সারা দেশে ১৯৭ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ হয়েছে। পেট্রোবাংলা নেটওয়ার্কে ২৫ হাজারের বেশি লিকেজ শনাক্ত ও মেরামত করেছে।

সংকট নিরসনে বিজিএমইর ৫ প্রস্তাব

তৈরি পোশাকশিল্পে গ্যাস সংকট নিরসন ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সাক্ষাৎকালে এই প্রস্তাব দেন বিজিএমইএ সভাপতি

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না পাওয়ার কারণে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না, যা রপ্তানি এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সংকট মোকাবিলায় বিজিএমইএ সভাপতি পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব করেন।

পোশাক ও বস্ত্রশিল্পকে অগ্রাধিকার : দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সুরক্ষার জন্য গ্যাসের নতুন সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে শ্রমঘন পোশাক ও বস্ত্রশিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত করা : তিতাস গ্যাসের নতুন সংযোগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় কর্তৃক যাচাই-বাছাই কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা।

আবেদনের তালিকা পৃথককরণ : লোড বৃদ্ধির প্রয়োজন নেই, শুধু সরঞ্জাম পরিবর্তন, পরিমার্জন বা স্থানান্তরের জন্য আবেদনকারীদের একটি আলাদা তালিকা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

গ্যাস রেগুলেশন : ধামরাই ও মানিকগঞ্জের মতো যেসব এলাকার গ্যাস পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে অবস্থিত কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যায়, সেখানে অন্তত তিন-চার পিএসআই চাপ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।