কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, দেশের জ্বালানি খাত বহুদিন থেকেই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি বহুজাতিক কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করে । নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বাড়িয়ে বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করে সেবা খাতে নিয়ে আসা এবং জ্বালানি অপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হলেই এই খাতকে এগিয়ে যাবে।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জ্বালানি খাত সংস্কার ও ক্যাবের ১৩ দফা দাবি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জ্বালানি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গোলটেবিলের আয়োজন করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এতে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা অংশ নেন।

গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন নরসিংদী- ৫ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন বকুল, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, শ্রমিক অধিকারকর্মী তাসলিমা আখতার প্রমুখ। আলোচনার শুরুতে বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জ্বালানি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ক্যাবের পক্ষ থেকে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বহুদিন থেকেই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। যে চুক্তিগুলো হয়, সেই টেবিলের দুই পাশেই একই পক্ষের লোক থাকে। ওই কোম্পানির দেশি বড় কোম্পানি কিংবা বিদেশি কোম্পানি এবং তাদের লোকজনের মধ্য দিয়ে চুক্তি হয়। এর ফলে বাংলাদেশে একের পর এক বিপুল সম্পদের ব্যয় হয়েছে এবং বাংলাদেশ ক্রমাগত একটা নির্ভরশীলতার মধ্যে আটকে যাচ্ছে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, জ্বালানি নিয়ে যে সংকট তৈরি হচ্ছে, সেটি নীতির কারণে হয়েছে। আমদানিনির্ভর, বিদেশি ঋণনির্ভর, বিদেশি কোম্পানিমুখী যেসব চুক্তি বিগত সময়ে হয়েছে এবং তার পেছনে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলে এখান থেকে বের হওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ও জাইকার নাম উল্লেখ করেন তিনি।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, বিদ্যুতের যে আমদানিমুখী কাঠামো, সেটি একটি মহাপরিকল্পনার অধীন হয়েছে। এটা হঠাৎ কোনো মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টারা করেননি। তিনি বলেন, এই মহাপরিকল্পনা করেছে জাইকা।

এ জন্য তৎকালীন সরকারকে দায়ী করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সরকার এমনই মেরুদ-হীন এবং জাতীয় দায়িত্ববোধহীন যে, তারা একটা জ্বালানি নীতি প্রণয়নের জন্য দেশের মানুষের ওপর ভরসা করে না। কারণ, তাদের দরকার বিদেশি কোম্পানিকে খুশি করা।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, জ্বালানি খাতে যে ভুলনীতি দিয়ে পরিচালিত হয়েছে, এই ভুলনীতির বিপরীতে দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞসহ অন্যদের নিয়ে আমরা যথাযথ নীতি প্রণয়ন করবো কি না, যদিও এটার জন্য বেশি সময় লাগবে না, ক্যাবের ১৩ দফা আমরা এর দৃষ্টিভঙ্গিকে সাপোর্ট করি।

সিপিবি এই নেতা বলেন, আমরাও বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তবে এই আলোচনা কোনো সরকার করেনি। আগের সরকার বাদ দিলাম, অন্তর্বর্তী সরকারও করেনি। ভুলনীতি পরিত্যাগ করে এরকম জায়গায় যাবো কি না সেটাই আমার কাছে প্রধান প্রশ্ন।

তিনি বলেন, সেই ভুলনীতি পরিত্যাগের ক্ষেত্রে তাহলে সক্ষমতা আমাদের নিজস্ব বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই, ওইটাকে আমরা প্রধান পয়েন্ট করবো কি না সেটা হচ্ছে প্রধান দেখার পয়েন্ট মনে করি। আমরা এই খাতকে কী খাত হিসেবে রাখবো, আমরা কি এটা ব্যবসায়িক খাত, বাণিজ্য খাত, নাকি সেবা খাতের কথা বলবো, আমি এইটা ঠিক বুঝতে পারি না।

ক্যাবের ১৩ দফা দাবি হলো : বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত থেকে পুনরায় সেবাখাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং মুনাফামুক্ত সরকারি সেবা নিশ্চিত করে ‘কস্ট প্লাস’ নয়, ব্যয়ভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ বাড়িয়ে আগামী পাঁচ বছরে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি কমপক্ষে ৫ শতাংশ কমানো। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করে পাঁচ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং ছোট শিল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া। এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত করা এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ বন্ধ করা; বাপেক্সসহ দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করা।

ছাতক (পূর্ব) ও ভোলা-দক্ষিণাঞ্চলের অব্যবহৃত গ্যাস মজুত ব্যবহারে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন। আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি বাতিল করা। স্পিডি অ্যাক্ট সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বাতিল, চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা; ক্ষতির দায় সংশ্লিষ্টদের থেকে আদায়। জ্বালানি খাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে বিচারের আওতায় আনা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার কমাতে ব্যয় ও মুনাফা কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং এলপিজি বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। সরকারি মালিকানায় এলপিজি টার্মিনাল ও রিফাইনারি স্থাপন এবং অন্তত ৫০ শতাংশ আমদানি ও সংরক্ষণ সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা। বিইআরসির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং প্রস্তাবিত আইন সংশোধন বাস্তবায়ন। ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি-২০২৪ অনুযায়ী গণবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি সুরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকা।