আ‘লীগ আমলে ব্যতিক্রমধর্মী কোনো কথা বললে গুম, খুন, জেলে যেতে হতো : এম সাখাওয়াত হোসেন
শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থা রেখে গেছে : ড.বদিউল আলম মজুমদার
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট নিয়ে জনগণকে বোঝানোর কাজটি শুধু অন্তর্বর্তী সরকার করতে গেলে অনেক কথা উঠবে। নির্বাচন কমিশনকেও গণভোট নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সে ক্ষেত্রে যা সহযোগিতা দরকার, তা সরকার করবে।রাজনৈতিক দলগুলো আগের মতোই চলতে চায়, নাকি পরিবর্তন হতে চাইছে এটা শোনা যাচ্ছে না। যেসব বড় দল ক্ষমতায় যাবে বলে মনে হচ্ছে, তাদের মুখেও সে ধরনের অঙ্গীকার শোনা যাচ্ছে না।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সিরডাপের মিলনায়তনে ‘গণভোট: ২০২৬ : কী ও কেন?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সুজনের সহ সভাপতি ও সাবেক বিচারপতি আব্দুল মতিন। প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। বক্তব্য রাখেন সুজনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ প্রমূখ।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট নিয়ে জনগণকে বোঝানোর কাজটি শুধু অন্তর্বর্তী সরকার করতে গেলে অনেক কথা উঠবে । এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকেও ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশনকেও গণভোট নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সে ক্ষেত্রে যা সহযোগিতা দরকার, তা সরকার করবে।’
এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো আগের মতোই চলতে চায়, নাকি পরিবর্তন হতে চাইছে এটা শোনা যাচ্ছে না। যেসব বড় দল ক্ষমতায় যাবে বলে মনে হচ্ছে, তাদের মুখেও সে ধরনের অঙ্গীকার শোনা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন,বাংলাদেশের একটা বিশাল বিপর্যয় আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। একটা প্রতাপশালী সরকার (ক্ষমাতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার) তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব ভেঙে পড়েছে। সবকিছু একটা ইল্যুশনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সে সময় কেউ ব্যতিক্রমধর্মী কোনো কথা বললে গুম, খুন, জেল, না হয় সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হতো।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এখন আমরা কী চাইছি? সেই অবস্থাতে ফিরতে চাচ্ছি? গণতন্ত্রের কথা বলে আমরা একনায়কতন্ত্রের দিকে যাচ্ছি কি না, ফ্যাসিবাদ দেখব কি না, ভোটবাক্স ক্যাপচার (দখল) হবে কি না, মন্ত্রণালয়কে পরিকল্পনা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে কি না...?’
আগের মতো অবস্থা না চাইলে ব্যবস্থা বদলাতে হবে বলে মন্তব্য করেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, সে জন্য গণভোটে সংস্কারের বিষয়গুলো জরুরি। কিন্তু এটা হবে কীভাবে? এটা নির্ভর করবে প্রথমত ভোটারদের ওপর। নির্বাচনের সময় বাকি এক মাস। গণভোট নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার যতটুকু হচ্ছে, ততটুকুই দেখা যাচ্ছে।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এটা (গণভোটে হ্যাঁএর পক্ষে প্রচার) নির্বাচন কমিশনেরও দায়িত্ব। এবার নির্বাচন কমিশনের কাজ ভোটের পাশাপাশি গণভোট কী, সেটা জনগণকে বলা। ইসিকে অনুরোধ করব, আপনারা মবিলাইজ করুন; শুধু ভোট নয়, গণভোট কীভাবে হবে সেটা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে অন্যদের সহযোগিতা নিন। এই কাজটা শুধু সরকার করতে গেলে অনেক কথা উঠবে।
সুজনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থা রেখে গেছে। স্বৈরাচারী কাঠামো ভাঙতে হলে সংস্কার লাগবে। আবারও যাতে আমাদের ওপর দানবের শাসন জেঁকে না বসে, তার জন্যই সংবিধানে কতগুলো মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। তার জন্যই গণভোট হচ্ছে। কিন্তু গণভোট নিয়ে অস্পষ্টতা আছে, নানা রকম বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারও চালানো হচ্ছে। এ সম্পর্কে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান প্রয়োজন।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ ও আলোচনার প্রক্রিয়া উল্লেখ করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তিন দফা আলোচনায় ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এর ভিত্তিতে জুলাই সনদ হয়েছে। সেখানে কিছু বিষয়ে কোনো কোনো দলের নোট অব ডিসেন্টও আছে। ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত, যার জন্য সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। বাকিগুলো অধ্যাদেশ জারি বা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন সম্ভব।
বৈঠকে গণভোটের খুঁটিনাটি তথ্য নিয়ে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন (উপস্থাপনা) সামনে রেখে সেটি ব্যাখ্যা করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কারের ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর গণভোট হবে। একে চারটি ভাগে ভাগ করা হলেও ব্যালটে একটিই প্রশ্ন থাকবে হ্যাঁ অথবা না। সংস্কারের পক্ষে থাকলে হ্যাঁ ভোট দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। এটা তারা মানতে বাধ্য।
গণভোটে তারা হ্যাঁ নাকি না এর পক্ষে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানান বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা, যেহেতু দলগুলো সনদে স্বাক্ষর করেছে ও এটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে, তাই তারাও গণভোটের ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করবে। আশা করি, তারা তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করবে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকানোর ব্যবস্থাপত্র হচ্ছে জুলাই সনদ। এটা অনুমোদন করে আমাদের জাতীয় জীবনে বাস্তবায়ন ঘটাতে না পারলে আবারও ফ্যাসিবাদ ফিরবে।
চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোই প্রান্তিক ভোটারদের বুথে নিয়ে পৌঁছাবে। তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ নিরক্ষর নারী সখিনা আপার কাছে আমাদের এই খবরটা পৌঁছাতে হবে যে তোমার অস্তিত্ব জাহির করার জন্য হ্যাঁনা ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে, তোমার ক্ষমতা প্রকাশ করার সুযোগ এসেছে, সুযোগটা হেলায় হারিও না?’
সভাপতির বক্তব্যে সাবেক বিচারপতি আব্দুল মতিন।বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। গণভোটের পক্ষে ধর্মীয় নেতাদের দিয়ে প্রচার করলে সেটা কার্যকর হবে। সংস্কার না হলে জনগণ যে আবার ফ্যাসিবাদে চলে যাবে, এটা প্রচার করতে হবে।