মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে পালিয়ে যাওয়া ৪০ রোহিঙ্গার একটি দল জানিয়েছে, ভারতের নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে তাদের সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়েছে। মে মাসে ভারত সরকার ওই রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিবিসি’র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই অমানবিক ঘটনার বিবরণ। সেখানে বলা হয়েছে, ভারত থেকে বিতাড়িত এই রোহিঙ্গারা এখন মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা দেশটির সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা একটি বিদ্রোহী বাহিনীর অধীনে আশ্রয় নিয়েছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৬ মে দিল্লী পুলিশ ৪০ জন রোহিঙ্গাকে বায়োমেট্রিকডেটা সংগ্রহের কথা বলে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। পরে তাদের দিল্লির ইন্দ্রলোক ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখা হয়। পরদিন ৭ মে, তাদের দিল্লি থেকে বিমানে করে বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ভারতীয় নৌবাহিনীর দুটি বাসে করে তাদের একটি নৌযানে তোলা হয়। রোহিঙ্গারা জানান, বাসে ওঠার পর তাদের হাত বাঁধা হয় এবং কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে দেওয়া হয়। নৌযানে ১৪ ঘণ্টা থাকার পর তাদের একটি বড় যুদ্ধজাহাজে তুলে নেওয়া হয়। রোহিঙ্গারা অভিযোগ করেন, এই যাত্রায় তাদের অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। অনেককে চড়-থাপ্পড় মারা হয়েছে। ফয়েজুল্লাহ নামের এক রোহিঙ্গা তার ডান হাতের ক্ষতের চিহ্ন দেখিয়ে নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তাদের ধর্ম নিয়েও উপহাস করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরে, ৮ মে রাতে তাদের ছোট ছোট চারটি নৌকায় তুলে গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এক রোহিঙ্গা জানান, সেখানে তাদের লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে হাত খুলে দেওয়া হয় এবং পানিতে ঝাঁপ দিতে বলা হয়। তাদের বলা হয় যে তারা ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছেন। কিন্তু পরে জেলেরা তাদের জানায় যে তারা আসলে মিয়ানমারে রয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক থমাস অ্যান্ড্রুস বলেছেন, তার কাছে এই অভিযোগগুলো প্রমাণ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। তিনি বলেন, ভারতের কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। এই ঘটনার বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার আইনজীবী কলিন গনসালভেস বলেন, মানুষ কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চায়নি যে একটি রাষ্ট্র কাউকে সমুদ্রে ফেলে দিতে পারে। তবে আদালত এই অভিযোগকে ‘কাল্পনিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ২৯ সেপ্টেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

বর্তমানে এই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের তানিন্থারি অঞ্চলের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর আশ্রয়ে রয়েছেন। তাদের আত্মীয়-স্বজনরা ভারতে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। নুরুল আমিন, যার ভাই এই দলে ছিলেন। তিনি বলেন, আমার মনে শুধু এই ভয় কাজ করছে যে ভারতীয় সরকার যেকোনো সময় আমাদেরও ধরে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেবে। এই ঘটনা ভারতে বসবাসকারী হাজার হাজার রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। তাদের অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছোন।