# ঈদের দিন ড. ইউনূসকে শাহবাজ শরীফের ফোন নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা

জাতীয় ঈদগাহে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামায আদায় করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের নামায আদায় করেন। নামায এবং খুতবা শেষে প্রধান উপদেষ্টা সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। ভাষণে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য সকলকে একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান।

ড. ইউনূস বলেন, আমরা অবশ্যই নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং আহত হয়েছেন তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। সরকার প্রধান বলেন, বিভিন্ন বাধা সত্ত্বেও আমরা আমাদের সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠব। আমরা এই নতুন বাংলাদেশকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, দেশের প্রতিটি স্থানে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপিত হচ্ছে। ঈদ হলো অন্যদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে ঘনিষ্ঠতা স্থাপনের একটি অনুষ্ঠান। সরকার প্রধান বলেন, ঈদ যে গভীর ভালোবাসার সাথে উদযাপন করা উচিত এই বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

তিনি জুলাইয়ের বিদ্রোহে শহীদদের আত্মার চির শান্তি কামনা করেন এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। বক্তব্যের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসী এবং বিদেশে ঈদ উদযাপনকারী প্রবাসী বাংলাদেশীদের শুভেচ্ছা জানান।

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাতে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, কূটনীতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এবং বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ যোগ দেন। ঈদের নামাযের পর প্রধান উপদেষ্টা ভক্তদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা প্রধান ঈদ জামাতে ঈদের নামায আদায় করেন। বাংলাদেশের শান্তি ও অগ্রগতি এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

এই জামাতে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। ক্বারী ছিলেন বায়তুল মোকাররমের মুয়াজ্জিন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজকে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে প্রতিটি বাজারে প্রতিটি গঞ্জে শহরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যারাই যেখানে ঈদের জামাতে শরিক হয়েছেন সবাইকে ঈদ মোবারক জানাচ্ছি। যারা ঈদের জামাতে শরিক হওয়ার সুযোগ পাননি তাদেরও ঈদ মোবারক। আমাদের মা-বোনেরা যারা ঘরে আছেন তাদেরও ঈদ মোবারক। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা যারা সারা বছর কষ্ট করেছেন আমরা জাতির পক্ষ থেকে তাদেরও ঈদ মোবারক জানাচ্ছি। যারা হাসপাতালে আছেন, রোগী, তাঁদেরও ঈদ মোবারক।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ঈদ দূরত্ব ঘোচানোর, নৈকট্য, ভালোবাসার দিন। দিনটি যেন ভালোভাবে উদযাপন করতে পারি,আজকে ঐক্য গড়ে তোলার দিন। আমরা স্থায়ী ভাবে ঐক্য গড়ে তুলতে চাই। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মোনাজাতে যাতে আমরা অবশ্যই স্মরণ করি, আমাদের বীর সন্তান যারা আমাদের মুক্তির জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, আল্লাহ যেন তাদের শান্তি দেন। যারা স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, দেশের জন্য নিজেদের স্বাভাবিক জীবন ত্যাগ করেছেন, তাদের জন্য আমরা প্রার্থনা করি।

অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান বলেন, যে নৈকট্য এবং ঐক্য আমরা শুরু করলাম তা নিয়ে যে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারি। আমরা অবশ্যই যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন তাদের স্বপ্ন পূরণ করবোই। আমরা নতুন বাংলাদেশ গঠন করবই, ইনশাল্লাহ। নামায শেষে প্রধান উপদেষ্টা সিকিউরিটির বেড়া ছিন্ন করে হাঁটতে হাঁটতে মুসল্লীদের সাথে হাত মিলান। মুসল্লিদের অনেকেই প্রধান উপদেষ্টার সাথে হাত মেলানোর জন্য এগিয়ে আসে। এই দৃশ্যকে অনেকে অভূতদৃশ্য বলে বর্ণনা করেন।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজের পর বিকেলে তেজগাঁওয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এসময় তিনি দেশবাসীকে ঈদুল ফিতরের বার্তা ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে এবং দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এবারের ঈদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা একে অপরের কাছাকাছি যেতে পারি, আমাদের দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারি, দেশ ও সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি। কারণ, এবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা অর্জন করতে হবে। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ড. ইউনূস বলেন, এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে এই বার্তা মনে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা একে অপরের প্রতি সহনশীল হব, আমরা পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলব। এর মাধ্যমে একটি সমাজে শান্তি ফিরে আসে। বাংলাদেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা এখন জরুরি এবং এটি প্রতিদিন আমাদের মনে রাখতে হবে।’ প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তারা (জনগণ) দেশে শান্তি চান যাতে মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের দিন কাটাতে পারে। তিনি বলেন, আমরা একে অপরের মঙ্গল কামনা করি এবং আমরা দেশ ও সারা বিশ্বের জন্য শান্তি কামনা করি।

ঈদের বার্তা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, ঈদ জাতি এবং তার জনগণকে পরিশুদ্ধ করার একটি অনন্য দিন, যাতে তারা সকল দূরত্ব এবং সকল পার্থক্য কাটিয়ে তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে পারে। তিনি বলেন, জাতির সেই ঐক্য দরকার, বিশেষ করে এই সময় যখন আমরা আমাদের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ঐক্য গড়ে তুলতে এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সকলের সাহায্য কামনা করেন।

উপদেষ্টাবৃন্দ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, কূটনীতিক, জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সদস্য, সংস্কার কমিশনের সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, সুশীল সমাজের সদস্য এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ফোন

এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ঈদের দিন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফোন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শরীফ মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি আগামীতে সুবিধাজনক সময়ে পাকিস্তান সফরের জন্য অধ্যাপক ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে অধ্যাপক ইউনূসও পাকিস্তানের জনগণকে শুভেচ্ছা জানান। শরীফ জানান, পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সফর করবেন। এর আগে দুটি বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের নেতারা ডিসেম্বরে কায়রোতে ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে এবং গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

ঈদের শুভেচ্ছা জানালেন নরেন্দ্র মোদি :

একইদিনে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে পাঠানো এক বার্তায় মোদি লেখেন, ‘পবিত্র রমজান মাসের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে, আমি এই সুযোগে আপনাকে এবং বাংলাদেশের জনগণকে ঈদুল ফিতরের আনন্দময় উৎসব উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। মোদি বলেন, পবিত্র মাসজুড়ে ভারতের ২০ কোটি ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম ভাই-বোনদের সঙ্গে রোজা পালন ও প্রার্থনার মাধ্যমে সময় কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, ঈদুল ফিতরের আনন্দঘন মুহূর্ত উদযাপন, আত্মসমালোচনা, কৃতজ্ঞতা ও ঐক্যের প্রতীক।

‘এটি আমাদের করুণা, উদারতা ও সংহতির মূল্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আমাদের দেশগুলোর মধ্যে এবং বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে আমাদের একসূত্রে গেঁথে রাখে’- বার্তায় উল্লেখ করা হয়। এই উৎসব উপলক্ষে মোদি আরো বলেন, তারা বিশ্বজুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি, সুস্বাস্থ্য ও সুখ কামনা করেন। নরেন্দ্র মোদি বলেন, আমাদের দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হোক- তিনি যোগ করেন।