ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির সপ্তম দিন আজ শনিবার। ইতিহাস বলছে, ১৯৪৭ সাল থেকেই এই জনপদে সমষ্টিগত বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। কারণ পাকিস্তান উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল এ অঞ্চলের প্রায় চার কোটি বাংলা ভাষাভাষী। ১৯৪৭ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর মাস ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে টালমাটাল। ঐ বছর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান বিভক্তির পর পরই কেন্দ্রীয় সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের কাছে অসহনীয় মনে হয়। এর আগে ১৭ মে দাক্ষিণাত্যের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত উর্দু ভাষা সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়- ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর মাত্র দুই মাস পরেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।’ এ ধরনের বক্তব্যের প্রতিবাদে সারা দেশে ঝড় ওঠে। রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তখনি কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল।
৪৭ সালের নবেম্বর মাসের প্রথমে বাংলাকে বাদ দিয়ে ডাক বিভাগের খাম, পোস্টকার্ড, ডাক টিকেট, রেল টিকেট, মানি-অর্ডার ফরম ইত্যাদি উর্দুর পাশাপাশি ইংরেজিতে ছাপা হয়। এর প্রতিবাদে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ এবং ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে। সভার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। আর বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো দাবি ওঠে। মিছিলের শ্লোগান ছিল- ‘বাংলাকে সব কিছুতে স্থান দিতে হবে’, ‘বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাথে বেঈমানী চলবে না’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, উর্দুর সাথে বিরোধ নাই’, ‘উর্দু-বাংলা ভাই ভাই’ ইত্যাদি। ১২ নবেম্বর ঢাকার বুদ্ধিজীবীগণ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পেশ করেন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে। ১৭ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে পূর্ব বাংলার ভাষা প্রশ্নে বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এ থেকেই মানুষ ফুঁসতে থাকে তীব্র ক্ষোভে।
ভাষা আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তি ডা. আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “ভাষা আন্দোলন শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং প্রদেশব্যাপী এ আন্দোলনের বিস্তার ঘটেছিল। এ আন্দোলনের মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যায় যে, পূর্ববঙ্গের একাধিক জেলা শহরে এমনকি মহকুমা শহরেও আন্দোলনের তীব্রতা ঢাকার ২২ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনকে মনে করিয়ে দেয়। আর যশোর তো এদিক থেকে এক পা এগিয়ে। কারণ যত দূর জানা যায়, ১৯৪৮ সালের আন্দোলনে অন্য কোথাও ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলীবর্ষণের ঘটনার কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। তাই ভাষা আন্দোলনে প্রথম গুলীবর্ষণ যশোরে ঘটেছে বলে ধরে নেয়া চলে।” বর্ণিত গ্রন্থে ‘মফস্বলে ভাষা আন্দোলন’ অধ্যায়ে নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, যশোর, সিলেট, খুলনা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর, ফরিদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, দিনাজপুর ও বরিশালে ভাষা আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে, বায়ান্নর ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার পর বিদ্রোহবহ্নি দাবানলের ন্যায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এর ধাক্কা লাগে নারায়ণগঞ্জেও। পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী মোতাবেক নারায়ণগঞ্জ রহমতুল্লাহ ইনস্টিটিউশনে বিভিন্ন বক্তা পুলিশের গুলীতে ঢাকার ছাত্রহত্যার বিস্তৃত বিবরণ পেশ করেন। সভা শেষে বিরাট মিছিল পুলিশের গুলীর প্রতিবাদে সমগ্র শহর প্রদক্ষিণ করে।