সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (CIPG) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, জুলাই অভ্যূত্থানের উপকারভোগী গোষ্ঠীগুলো প্রতিবিপ্লবের বিষয়ে সচেতন নয়। যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা যদি অবহেলায় হারিয়ে ফেলি তাহলে স্বৈরাচার আবার ফিরে আসবে। তাই রাষ্ট্রীয় সংস্কার করতে হবে। শুধু ভোট আয়োজন করাই সংস্কার নয়। যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে সেগুলো আগামী দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে।

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে “রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদঃ বর্তমান প্রেক্ষিত” শীর্ষক গোল টেবিলের আয়োজন করা হয়। CIPG এর চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মো: মোজাম্মেল হক উক্ত অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। সাবেক সচিব ড. মো: শরিফুল আলম এর সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে কি-নোট উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারিসুল করিম।

প্যানেল আলোচক ছিলেন, সাবেক সচিব মু. আবদুল কাইয়ূম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির এনডিসি, পিএসসি (অব:), দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, মো: এনামুল হক চৌধুরী এফসিএ, অতিরিক্ত সচিব (অব:) ও জাতিসংঘ জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বি সাদিক আহমেদ প্রমুখ।

অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে সেগুলো আগামী দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে । আর যেগুলোতে একমত হয়নি সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলমান রাখতে হবে। তিনি আরোও বলেন, প্রবাসীরা পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যগত ভূলগুলো শোধরাতে পারবে না। সরকার পাসপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে প্রবাসীদের ভোটার লিস্ট ও পোস্টাল ব্যালট করতে পারে। কেউ চাইলে সরাসরি ভোট দিতে পারবে অথবা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তারা অগ্রীম ভোট দিতে পারবে। বর্তমান আইন অনুযায়ী দেশের ভিতরেও পোস্টাল ব্যালট উন্মুক্ত করলে সবাই ভোট দিতে পারবে, এতে ভোটের সংখ্যা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের উপকারভোগী গোষ্ঠীগুলো প্রতিবিপ্লবের বিষয়ে সচেতন নয়। যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা যদি অবহেলায় হারিয়ে ফেলি তাহলে স্বৈরাচার আবার ফিরে আসবে। তাই রাষ্ট্রীয় সংস্কার করতে হবে। শুধু ভোট আয়োজন করাই সংস্কার নয়।

তিনি বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিশেষত জামায়াত বিএনপির ঐক্য ধরে রাখতে হবে। ইসলামী ও মধ্যপন্থী দলগুলোর ঐক্য মজবুত করতে হবে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে এই অনির্বাচিত সরকারকে। তাই সবাইকে সাবধানে কথা ও কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, আনুপাতিক পদ্ধতিতে ভোটের অনেক সুবিধা আছে। এই পদ্ধতিতে ভোট হলে সবার ভোট গণনা হয়। সবার ভোটের গুরুত্ব পায়। তবে এই পদ্ধতিতে কোন দল একক সংখ্যাগরিস্ঠতা পায় না। তাই সরকার স্বৈরাচারী হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা করতে হবে। পিআর হবে, না একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতিতে হবে তা রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করবে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হওয়া উচিত ছিল। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি না থাকার কারনে মব ভায়োলেন্স হচ্ছে। স্থানীয় নির্বাচন একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি ও জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য উপযোগী যেকোন পিআর পদ্ধতিতে হতে পারে।

অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লব ছিল অরাজনৈতিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যাতে আপামর সকল শ্রেণী পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তাই জুলাই যে আকাক্সক্ষায় সংগঠিত হয়েছিল তা এই সনদে উল্লেখ থাকতে হবে। সকল জাতি, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী চাকমা মারমাদের অধিকারও এই সনদের দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, দুর্নীতিদমন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, সামাজিক সমতা ও ন্যায্যতা, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন আনয়নের জন্য এই সনদকে অবশ্যই আইনি দলিল হিসেবে রাখতে হবে। সংবাদ মাধ্যম, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিচার বিভাগসহ সকল প্রতিষ্ঠানকে পূর্বের সরকার ধ্বংস করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল যে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে রায় দিয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই সাংবিধানিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ক্ষমতার ভারসাম্য ইত্যাদি জুলাই সনদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের রুপরেখা থাকতে হবে।

অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারিসুল করিম বলেন, বর্তমান একক সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচন পদ্ধতিতে ম্যান্ডেটের ক্রাসিস থাকে। যদি তিনটি প্রধান দল যদি নির্বাচন করে তাহলে মাত্র ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৫১ টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। আবার ৪ টি দল অংশগ্রহণ করলে ১৩/১৪ শতাংশ ভোট পেয়েও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।। এছাড়াও কিছু কিছু আসনে বা জেলায় এককেন্দ্রীক নির্বাচন হয় যা ঠেকানো যায় না। ১৫১ টি দেশে কোন না কোন ভাবে আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। ইউকে এবং ইউএসএ তে র‌্যাংক ভোটিং চালু হয়েছে যা একটি আনুপাতিক পদ্ধতি। বর্তমান পদ্ধতির মতোই পিআর পদ্ধতিতেই ভোট হতে পারে যেখানে একক সংখ্যাগরিষ্ট পদ্ধতিতে ৩০০ আসনে নির্বাচন হবে এবং ৩০০ আসনের জন্য আনুপাতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির এনডিসি, পিএসসি (অব:) বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দৃশ্যমান বিচার ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা জনগণ দেখতে পারছে না। এখন ১/১১ এর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। একটি স্বচ্ছ্ব নির্বাচনের জন্য সশ্রস্ত্রবাহিনী ও প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফ্যাসিস্ট সরকারর তৈরি করা ভোটার লিস্ট, আসনের সিমানা ও প্রশাসন দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়।

সাবেক সচিব মু. আবদুল কাইয়ূম বলেন, সনদ না সংবিধান এই বিতর্ক তোলা হছ্ছে। সনদের আলোকেই সংবিধান রচনা করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য যেসমস্ত প্রতিষ্ঠান কাজ করবে তাদেরকে সংস্কার করতে হবে। স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া প্রশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে।

এনামুল হক চৌধুরী এফসিএ বলেন, এমপিদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন করা। আইনপ্রণেতারা এলাকার উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনায় সম্পৃক্ত থাকেন বিধায় আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। তাই আমাদেরকে আইনপ্রণতাদেরকে উন্নয়ন কর্মকান্ড হতে বিরত রাখতে হবে। তিনি আরোও বলেন, ভোটার লিস্ট দ্বারা সঠিক ভোটার চিহ্নিত করা যায় না, তাই সঠিক ভোটের জন্য জাতীয় পরিচয় পত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রবাসীদেরকে ভোটদান নিশ্চিত করতে হবে।

দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক জনাব মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, জুলাই সনদের যদি আইনী ভিত্তি না থাকে তাহলে এই সনদের কোন গুরুত্ব থাকবে না। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাই হলো সাংবিধানিক ভিত্তি। তাই জুলাই সনদের বিষয়গুলো এখন থেকেই বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। পরবর্তী সরকারের জন্য ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। ঘোষিত নির্বাচন অনিশ্চিত হবে যদি জুলাই অভ্যূত্থানের রাজনৈতিক শক্তিগুলো নির্বাচন পদ্ধতি ও জুলাই সনদের আইনী ভিত্তি নিয়ে একমত না হয়।

বক্তারা দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, প্রবাসী ভোটারদের ভোটদান নিশ্চিত করা, ফ্যাসিবাদী প্রশাসন ব্যবস্থা সরিয়ে নিরপেক্ষ, দক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারুপ করে তাদের স্ব স্ব বক্তব্য উপস্থাপন করে। এছাড়াও তারা বাংলাদেশের উপযোগী আংশিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ((Partial Proportiaonl Representation-PPR) পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপর গুরুত্বারুপ করেন এবং পিপিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা হতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।