রিউমার স্ক্যানারের ভূয়া খবরের অনুসন্ধান

মুহাম্মদ নূরে আলম: জুলাই বিপ্লবের পর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশ বিরোধী ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। আর বর্তমানে ইসলাম ও ইসলামপন্থী দল-ব্যক্তি বিশেষ করে জামায়াতের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মাধ্যমে ভারত তার সনাতনী উগ্র সাম্প্রদায়িক চরিত্র নতুন করে প্রকাশ করে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ভারতীয় মিডিয়ায় জামায়াত বিরোধী অপপ্রচার ও ফেইক নিউজ প্রচার বাড়ছে। রিউমার স্ক্যানারের এক অনুসন্ধানে ভারতের ৪৯ গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে ভুয়া খবর প্রচার করে, এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানকে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভারতের গণমাধ্যমে জামায়াতকে ধর্মীয় ‘উগ্রবাদী’ ও আঞ্চলিক ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এইধরনের উদ্দেশ্যমূলক একপেশে অপতথ্য দিয়ে অপপ্রচারের শীর্ষে রয়েছে, ফার্স্টপোস্ট-এর পালকি শর্মা ও সায়ন্তন ঘোষ, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আনন্দবাজার পত্রিকা, ইন্ডিয়া টুডে, দ্যা হিন্দু, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, দ্যা ইকোনমিস টাইমস। আর রিপাবলিক বাংলা যেভাবে দলটিকে উপস্থাপন করছে, তাতে এই উদ্দেশ্যটি আরো স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। এই সব অপপ্রচার সম্পর্কে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সাহাবুল হক বলেন, আগামী নির্বাচনে জামায়াতকে বির্তকিত করতে এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থান হিসেবে চিহিৃত করতেই অপপ্রচার চলছে।

এদিকে কলকাতার এবিপি আনন্দ, রিপাবলিক বাংলার মতো গণমাধ্যমগুলো অনবরত প্রচার করছে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ একটি তালিবানি রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আল জাজিরা এবং রয়টার্সের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে, তখন ভারতীয় গণমাধ্যম সেটিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এ ধরনের প্রচারণা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে তুলবে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারতে রেজিস্ট্রার দৈনিক রয়েছে সাময়িকীয়পত্রসহ ১ লাখ ৪৬ হাজার, নিয়মিত প্রকাশিত হয় ৯ হাজার থেকে ১৭ হাজার সংবাদপত্র। এরমধ্যে বার্ষিক হালনাগাদ তথ্য মতে, ৮ হাজার ৯৩০টি দৈনিক সংবাদপত্র নিয়মিত প্রকাশিত হয়, যে সংবাদপত্রগুলোর প্রচার সংখ্যা ২৪০ মিলিয়ন কপি। এছাড়াও ৯১৮টি টিভি চ্যানেলের প্রতিদিন ভিউয়ার রয়েছে ৯০০ মিলিয়ন। অরুন্ধতী রায়ের লেখা এক কলামে বলা হয় ৫০ ব্রাহ্মণ পরিবার ভারতের সিংহভাগ সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ করে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ও বিজেপির সমর্থক দৈনিক হিন্দু পত্রিকার হিন্দী ভাষার সংস্করণ প্রতিদিন বের হয় ৫ কোটি কপি এবং প্রায় ৫ লাখ সাংবাদিক-কর্মচারী এই পত্রিকায় কাজ করে।

জামায়াতের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের নমুনা: গত বছরের ১৫ আগস্ট ২০২৫ ভারতের হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়ে মৃতদেহ টেনে তোলার ভিডিওকে ‘জামায়াত নেতার নির্দেশে খুন’ করা হয়েছে দাবিতে ইন্টারনেটে প্রচার করা হচ্ছে, যা মিথ্যা বলে শনাক্ত করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর ফ্যাক্ট চেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্ট।

আনন্দবাজার পত্রিকা জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বিবৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির ওয়েবসাইটে ১৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ‘জামায়াত নেতার নির্দেশে হত্যাকা-’ শিরোনামের ভিত্তিহীন ও মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশ।

গত বছরের ১৬ আগস্ট ২০২৫ ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির ওয়েবসাইটে ১৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ‘জামায়াত নেতার নির্দেশে হত্যাকা-’ শিরোনামের ভিত্তিহীন ও মিথ্যা প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম।

সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ভারতীয় একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমের এমন ধরনের অপপ্রচার গোয়েবলসীয় প্রচার কৌশলকেও হার মানিয়েছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর থেকেই ভারতের কিছু মিডিয়া জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ পরিবেশন করে চলেছে যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণসহ আন্তর্জাতিক সমাজকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে। এই ধরনের তথ্যসন্ত্রাসের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। বরং এতে ভারতীয় গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

রিউমার স্ক্যানারের অনুসন্ধান: রিউমার স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১২ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত অন্তত ১৩টি ভুয়া খবর পাওয়া গেছে। ভুয়া খবর প্রচারের তালিকায় ভারতের অন্তত ৪৯টি গণমাধ্যমের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে রিপাবলিক বাংলা সর্বাধিক পাঁচটি গুজব প্রচার করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে হিন্দুস্তান টাইমস, জি নিউজ ও লাইভ মিন্ট অন্তত তিনটি করে গুজব প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া, রিপাবলিক, ইন্ডিয়া টুডে, এবিপি আনন্দ এবং আজতক অন্তত দুটি করে গুজব প্রচার করেছে। বাকি ৪১টি গণমাধ্যম অন্তত একটি করে গুজব প্রচার করেছে।

এই সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চায়। বিজেপিপন্থি ফার্স্টপোস্টের এডিটর পালকি শর্মার বিশ্লেষণে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে, জামায়াত জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকায় এখন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নেই বলে দাবি তুলছে। অন্যদিকে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির পরপর পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেলেও ভারতীয় গণমাধ্যম এই জনসমর্থনকে প্রচার না করে বরং সেটিকে ‘র‌্যাডিক্যালাইজেশন বা উগ্রবাদের বিস্তার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সাহাবুল হক বলেন, ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীকে ‘উগ্রবাদী’ ও ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতার একাধিক সম্ভাব্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মহলে জামায়াতকে যেন একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়, এমন একটি ধারণা তৈরি করা, যাতে করে জামায়াতকে চাপে ফেলতে পারে। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ইস্যু তুলে ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে। তৃতীয়ত, নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসলামী রাজনীতি ও নিরাপত্তা প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেওয়াও একটি উদ্দেশ্য হতে পারে।

বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং ভোট-রাজনীতি: ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কেন্দ্রগুলো, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক অপকৌশল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের একটি প্রধান কারণ। বিজেপি দলের নেতৃত্বে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘু-বিরোধী নীতির মধ্য দিয়ে এই অপপ্রচার আরও তীব্র হয়েছে। ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, এবং ত্রিপুরা- যেখানে বাঙালি ও মুসলিম জনগণের বসবাস রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ ও মুসলিম-বিদ্বেষী মনোভাব জোরদার করার জন্যই এই ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, যেমন বিবিসি বা আলজাজিরার দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই প্রচারণার বিপরীত একটি চিত্র পাওয়া যায়। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, ভারতীয় মিডিয়া যে ‘ফেয়ার’ নির্বাচনের কথা বলছে, তাদের সংজ্ঞায় সেখানে জামায়াতের কোনো জায়গা নেই। এটি এক ধরনের ‘সিলেক্টিভ জার্নালিজম’ যেখানে ছাত্র নির্বাচনে জামায়াতের বিপুল বিজয়কে সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হয়েছে, অথচ সেই বিজয়ই ছিল বর্তমান জনমতের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন। ভারতীয় সরকারের বর্তমান অবস্থান এবং তাদের মিডিয়া প্রোপাগান্ডার মধ্যে এক গভীর যোগসূত্র রয়েছে।