বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রভাব ক্রমাগত কমে আসছে। ১৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করেছেন এবং প্রায় ২৭ শতাংশ জানিয়েছেন যে, এসব সতর্কবাণী তাদের ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করেছে। তবে ৪৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, খুচরা শলাকা ক্রয় করার কারণে তারা এসব সতর্কবার্তা কখনো স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করেননি। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ৩ টায় রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ওমনি রেসিডেন্সিতে “তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রভাব ও বিকল্প ছবির প্রয়োজনীয়তা” শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

WhatsApp Image 2026-03-12 at 7.00.35 PM

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্তন ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাইফুর রহমান

এছাড়াও বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটির নির্বাহী পরিচালক কে এম মাকসুদ, বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস এর সিনিয়র ডেপুটি ডিরেক্টর মোঃ শামীমুল ইসলাম, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের প্রোগ্রাম অফিসার ডাঃ ফরহাদুর রেজা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার ডাঃ এস এম ইশতিয়াক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর প্রকল্প পরিচালক (তামাক নিয়ন্ত্রণ) হামিদুল ইসলাম হিল্লোল, স্টপ-এর ফোকাল পারসন ফাহমিদা ইসলাম প্রমুখ।

টিসিআরসির প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ শাগুফতা সুলতানা, এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিসিআরসির প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মোঃ বজলুর রহমান

মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, গবেষণাটি অক্টোবর ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ সময়কালে পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ জন ধূমপায়ী এবং অধূমপায়ীর উপর জরিপ করা হয় এবং পাঁচজন বিশেষজ্ঞের কী-ইনফরমেন্ট সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৫১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী লক্ষ্য করেছেন। যদিও ৫৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী গুলো দীর্ঘদিন থাকার ফলে তাদের উপরে কোন প্রভাব ফেলছে না। বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার থেকে উঠে এসেছে যে, সিগারেট/বিড়ির খুচরা শলাকা বিক্রি এবং পানের সাথে জর্দ্দা খাওয়ার প্রচলন সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর কার্যকারিতা আরো কমিয়ে দিচ্ছে। তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর ব্যবহার তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং এর ব্যবহার কমাতে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি কার্যকর পদ্ধতি। বাংলাদেশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রবর্তন করা হয় ২০১৬ সালে। বিগত ১০ বছর ধরে একই ছবি ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে ছবিগুলো তাদের আবেদন হারিয়ে ফেলছে।

ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক বলেন, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার একটি কার্যকর উপায়। সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী শুধু ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তেই নিরুৎসাহিত করে না, পাশাপাশি নতুন করে ধূমপান যারা শুরু করতে চায়, তাদেরকেও নিরুৎসাহিত করে। গবেষণায় উঠে আসা ফলাফল থেকে বোঝা যায়, সতর্কবাণীর কার্যকারিতা বাড়াতে নিয়মিতভাবে ছবি পরিবর্তন করা এবং আরও শক্তিশালী ও দৃষ্টিগ্রাহ্য ছবি ব্যবহার করা প্রয়োজন।

সভাপতির বক্তব্যে শাগুফতা সুলতানা বলেন, গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন একই ধরনের ছবি ব্যবহারের ফলে মানুষ সেগুলোর প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। তাই তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলে ধরতে আরও শক্তিশালী ও বাস্তবধর্মী নতুন সতর্কচিত্র সংযোজন করা প্রয়োজন।

সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, ২০১৬ সালের পর বিশ্বের যেসকল দেশ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রবর্তন করেছে, তারা ইতোমধ্যেই একাধিকবার এই ছবির সেট পরিবর্তন করেছে। ফিলিপাইন ২০১৬ সালে ছবি প্রবর্তনের পর থেকে ২৬ সাল পর্যন্ত ৬ বার, সাউথ কোরিয়া ৫ বার, মায়ানমার ৩ বার ছবির সেট পরিবর্তন করেছে। এছাড়াও, কলম্বিয়া ২০১০ সাল থেকে ১৬ বার, ভারত ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৮ বার, সেনেগাল ২০১৭ সালে ছবি প্রবর্তনের পর ৫ বার ছবির সেট পরিবর্তন করেছে। এই তথ্য দিয়েই বোঝা যাচ্ছে যে, ছবির সেট নিয়মিত পরিবর্তন করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমরা বিগত ২০১৬ সালের পর বিগত ১০ বছরে একবারও ছবি পরিবর্তন করি নাই।

বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশে সিগারেট ও বিড়ির খুচরা শলাকা বিক্রির কারণে অনেক ধূমপায়ী তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেখার সুযোগ পান না। ফলে সতর্কবাণীর উদ্দেশ্য অনেকটাই ব্যাহত হয়। এ ক্ষেত্রে খুচরা শলাকা বিক্রি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সতর্কচিত্র আরও শক্তিশালী ও দৃষ্টিগ্রাহ্য করা প্রয়োজন।

মুক্ত আলোচনায় তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকরা অংশ নেন। আলোচকরা সম্প্রতি পাশকৃত অধ্যাদেশটি দ্রুত আইন হিসেবে পাশ করানো, ৭৫% সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর বাস্তবায়ন, সতর্কবাণীর ছবির সেট পরিবর্তন, এবং নিয়ম অনুযায়ী সতর্কবাণী প্রদান না করলে আইন লঙ্ঘনকারী তামাক কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।