জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কারের জন্য গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে আগামী ২ মে পর্যন্ত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দল। ২ মে’র পরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে বলে জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।
গতকাল বৃহস্পতিবার মগবাজার আল ফালাহ মিলনায়তনে ১১ দল আয়োজিত চলমান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। কর্মসূচি ঘোষণা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী ১৮ এপ্রিল শনিবার ১১ দলের উদ্যোগে ঢাকায় গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। ২৫ এপ্রিল শনিবার ঢাকা বাদে বাকী সব বিভাগীয় শহরে গণ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২ মে, প্রত্যেকটি জেলা শহরে গণ মিছিল হবে। তিনি বলেন, এই ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরে লিফলেট বিতরণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি বলেন, ২ মে এর পর থেকে বিভাগীয় শহরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ১২টি সিটি কর্পোরেশনে বিক্ষোভ সমাবেশ হবে। এগুলোতে ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। এই রাউন্ড শেষ হওয়ার পর রাজধানীতে ১১ দলের বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। তারিখ পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে।
এর আগে মগবাজারস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে ১১ দলীয় ঐক্যের চলমান আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণের লক্ষ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি, এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর আবদুল মাজেদ আতহারী ও মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, জাগপার মহাসচিব অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, বিডিপির মহাসচিব নিজামুল ইসলাম নাঈম, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন প্রমুখ।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, এই ধাপ শেষে নেওয়া হবে পরবর্তী ধাপের কর্মসূচি। সেই ধাপে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও বিভাগীয় শহরে ১১ দলের উদ্যোগে বিশাল সমাবেশ হবে। সমাবেশসহ কর্মসূচির দিনক্ষণ পরবর্তী সময়ে ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে ঠিক হবে। এরপর ১১ দল রাজধানীতে বিশাল সমাবেশ করবে। সেই সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকার গণরায় মানছে না। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নই ১১ দলের আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য। জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিয়ে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সে পর্যন্ত ১১ দল দফায় দফায় কর্মসূচি দেবে।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। গণভোটের মাধ্যমে ৫ কোটি মানুষ বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্য দিয়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতির লক্ষ্যে দলীয়করণ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত এবং একক ব্যক্তির কর্তৃত্ব থেকে দেশকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। আমরা এখন বেদনার সাথে দেখতে পাচ্ছি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান সরকার তা থেকে ইউটার্ন করে নানান অজুহাত তুলে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করে গুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুতে বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রতি অবিচার করা হয়েছে, অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি জ্বালানি মন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, গণভোটের যে গণরায় তা বাস্তবায়নই আমাদের আন্দোলনের প্রধানতম লক্ষ্য। কিন্তু, বিদ্যমান যে জনদুর্ভোগ, জ্বালানি সংকট চললেও জ্বালানি মন্ত্রী হাস্যকরভাবে বলছেন দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য গাড়ির দীর্ঘ লাইন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা তেল পাচ্ছেন না। এমনকি সংসদ সদস্যরা তেল না পেয়ে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সার সংকট জ্বালানি থেকেই তৈরি হচ্ছে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি দিয়ে ফসল কাটা, মাড়াইয়ের জন্য জ্বালানি প্রয়োজন। আসন্ন বোরো মৌসুমে জ্বালানির প্রয়োজন।
দেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সারা দেশে দেড় লক্ষাধিক হামের রোগী হাসপাতালে সংকটাপন্ন। স্বাস্থ্যখাত একেবারে ভেঙে পড়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও হাসপাতালের চেহারা বিপরীত। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। চাঁদাবাজি, খুনখারাবি ও দখলদারি আবারও চলছে। একটি দলের নেতৃত্বে বিভিন্ন দখলবাজি শুরু হয়েছে। ব্যাংক খাত ধ্বংস করা হয়েছে। এমন কোনো নজির আছে কিনা, একটি দল ক্ষমতায় এসে দেড় মাসে ৪০-৪২ হাজার কোটি টাকা শুধু ব্যাংক থেকে ঋণ করেছে, প্রশ্ন করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ব্যাংকগুলো খালি করে নিজেদের সিন্ডিকেটের লোকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোয় আমানত রাখা কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহক এখন রাজপথে নামছেন, কথা বলছেন। প্রশাসনে সচিবালয় থেকে শুরু করে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধস্তন পর্যন্ত দলীয়করণ, পদত্যাগে বাধ্য করা, ওএসডি করে ফ্যাসিবাদী কায়দায় সব সরিয়ে দিচ্ছে সরকার। দৃশ্যত, শাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের গণরায়কে বাস্তবায়নের চলমান আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতির আলোকে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। জনদুর্ভোগ কমানোর দাবিতে ১১ দলের আন্দোলন চলমান থাকবে বলেও জানান গোলাম পরওয়ার।