৬ কোটি ১২ লাখ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা

প্রস্তুতি কেবল কাগজেকলমে

গত কয়েক মাসের ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। কয়েক সেকেন্ড ধরে এই কম্পন স্থায়ী হয়। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ অন্যান্য জেলায়ও কম্পন অনুভূত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ এবং এর আশপাশে ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলো বড় ভূমিকম্পেরই পূর্বাভাস। ঐতিহাসিক ভূমিকম্পের পরম্পরা বিশ্লেষণ এবং দিন দিন সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই বিষেশজ্ঞরা বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের শঙ্কা করছেন। ভূতত্ত্ববিদরা মাত্রাগত পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের দুই ধরনের ভূমিকম্পের কথা বলছেন। এক ধরনের ভূমিকম্প হলো রিখটার স্কেলে ৮ বা এর চেয়ে বেশি। আরেক ধরনের হলো ৭ বা এর চেয়ে বেশি।

সূত্র মতে, গতকাল বেলা ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। ঢাকার আগারগাঁও আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ১৮৮ কিলোমিটার। পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা এই তথ্য জানান। এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, উৎপত্তিস্থলে কম্পনের মাত্রা ৫ দশমিক ৩। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ূন আখতার জানান, পরপর দুই দফা এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা বলে তিনিও জানিয়েছেন। সাতক্ষীরা থেকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভূমিকম্পে সেখানে জোরে ঝাঁকুনি হয়। অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জানা গেছে, একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ অন্যান্য জেলায়ও কম্পন অনুভূত হয়েছে। সেখানে রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫।

এর আগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গত বুধবার রাতে ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ১। বুধবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। এটিও ছিল মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এ মাসের শুরুতে ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলা।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবীর বলেন, যেখানে ভূমিকম্পটি হয়েছে, সেটি কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এর আগেও এখানে ভূমিকম্প হয়েছে। এ নিয়ে আশঙ্কার কোনো কারণ নেই।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কম্পনের পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। যদিও বেশিরভাগ ভূমিকম্পের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম, তবু ধারাবাহিকভাবে এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

ভূতত্ত্ববিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত বিশাল টেকটোনিক প্লেটগুলো সব সময়ই ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। এসব প্লেটের সংযোগস্থল বা ভূ-ফাটলে দীর্ঘদিন ধরে চাপ জমে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর সেই চাপ মুক্ত হলে তা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। দেশের কিছু এলাকায় সক্রিয় ভূ-ফাটল থাকায় সেখানে মাঝেমধ্যে কম্পন অনুভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ ছাড়া ভূ-গর্ভস্থ পানিরস্তরের পরিবর্তন এবং চাপের তারতম্যও ক্ষুদ্র ভূমিকম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, খনিজ সম্পদ আহরণ কিংবা খনি কার্যক্রমের ফলে মাটির নিচের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাবে ভূ-গর্ভে চাপের অস্থিরতা তৈরি হয়ে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পন দেখা দিতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে সক্রিয় ভূ-ফাটলও দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ঝুঁকির কারণ হয়ে আছে। এসব ফাটলের নড়াচড়া ও অভ্যন্তরীণ চাপের পরিবর্তনের ফলেই অনেক সময় ভূমিকম্প ঘটে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন এলাকায় ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা ও নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি।

ভূ-তত্ত্ববিদরা জানান, বাংলাদেশকে ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিচ্ছে। বিষেশজ্ঞরা বাংলাদেশে বড় মাত্রার (৮ মাত্রার) ভূমিকম্পের শঙ্কা করছেন। গত নভেম্বর মাসে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পন জানান দিয়েছে বাংলাদেশ কতটা ভুমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। নির্মাণবিধি মেনে ভবন তৈরি না করায় বাংলাদেশের অনেক ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। এতে বহু হতাহতের শঙ্কাও করছে সংস্থাটি। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বাংলাদেশেও মিয়ানমারের (৭ দশমিক ৭ মাত্রা) মতো একই মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষত ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চল উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্পন হলে সারা দেশে ৬ কোটি ১২ লাখ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কার কথা বলা হয়েছে খোদ দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে।

ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আশপাশে যেসব ভূমিকম্প হয়, তার মধ্যে সাধারণত ৮ বা এর চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পর ফিরে আসে। আর ৭ বা এর চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে ফিরে আসে। বাংলাদেশ বা এই ভূখণ্ডে বড় ভূমিকম্পের মধ্যে আছে ১৭৬২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫। এটি ‘গ্রেট আরাকান আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। এর ফলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ফেনী ও কুমিল্লা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর ১৮৯৭ সালে আসামে সংঘটিত ভূমিকম্প ছিল ৮ দশমিক ৭ মাত্রার। ১৯১৮ সালে সিলেটের বালিসিরা উপত্যকায় ৭ দশমিক ৬ মাত্রায় এবং ১৯৩০ সালে আসামের ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

ভূতত্ত্ববিদ ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, গেল কয়েক শ’ বছরের ইতিহাসে এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে সিলেট পর্যন্ত এলাকায় বিগত ৪০০ থেকে হাজার বছরের ইতিহাসে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। ফলে এসব স্থানে ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার মতো অতি শক্তি জমা হয়ে আছে। ফলে সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৮ মাত্রারও বেশি ভূমিকম্প হওয়ার শক্তি জমা আছে। যেকোনো সময় সে শক্তি বের হয়ে আসতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: জিল্লুর রহমান বলেন, মিয়ানমান বা নেপালের মতো অত বেশি ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকি আমাদের নেই। ওদের ওখানে সর্বশেষ ১৯৪৬ সালে বড় ভূমিকম্প হয়েছে। ফলে ৮০ বছরের মধ্যে সেখানে আবারো বড় ভূমিকম্প হয়ে গেল। আমাদের এখানে কিন্তু সর্বশেষ ১৯১৮ সালে বড় ভূমিকম্প হয়েছে। এক শ’ বছরের বেশি হয়ে গেছে। এখানে দেড় শ’ বা ২০০ বছর পরপর ওই ধরনের ভূমিকম্প হয়। সে হিসাবে আমরাও ঝুকির মধ্যে আছি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ছোট ও মাঝারি ভূকম্পনে বড় শক্তি বের হওয়ার একটা প্রবণতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তার মানে, যেকোনো সময় একটি বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে বড়মাত্রার ভূকম্পন হলে কি ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে যদি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে সারা দেশে ৬ কোটি ১২ লাখ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়বে। ১১ লাখ ৯ হাজার পাকা ভবন, ২১ লাখ ১৪ হাজার সেমিপাকা স্থাপনা, ৪০২টি খাদ্যগুদাম, ১৪টি গ্যাসফিল্ড, ১৯৫টি হাসপাতাল। এক হাজার আটটি কল্যাণকেন্দ্র, দুই হাজার ৮০০ উচ্চবিদ্যালয়, এক হাজার ৯০০ মাদ্রাসা, ১৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছয় হাজার ৮০০ পুলিশ স্টেশন, এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, সাত হাজার ৪০০ কিলোমিটার স্থানীয় সড়ক, ২০ হাজার ব্রিজ, এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশে যে ভূমিকম্প মোকাবেলায় প্রস্তুতির অভাব রয়েছে তাও স্বীকার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পে যদি রাজধানীর এক শতাংশ বিল্ডিং ধসে পড়ে তাহলে তিন লাখ মানুষ হতাহত হবেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থেকে আরো অনেকের মৃত্যু হবে। এ অবস্থায় ভূমিকম্প সহনীয় নিরাপদ অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ এসেছে বিশেষজ্ঞদের কাছে থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: জিল্লুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা বহু বছর ধরে বলে আসছি, প্রস্তুতি নিতে হবে। নতুন ভবনগুলো কোড মেনে বানাতে হবে। আর পুরানগুলো সার্ভে করে যেগুলো একেবারেই দুর্বল সেগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। আর যেগুলোর স্টেন বাড়ানো সম্ভব সেটা করতে হবে। আমাদের আরো বেশি প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের এখানে যদি থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের মতো ওই মাত্রায় ভূমিকম্প হয় তাহলে অবস্থা হবে ভয়াবহ।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য মতে, বাংলাদেশ ভূকম্পনের সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। দুর্যোগ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে রয়েছে ঢাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছোটখাটো কম্পন দেশের আরো শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা নির্দেশ করে।

অনুসন্ধান বলছে, ভূমিকম্পের সব থেকে বেশি ঝুঁকিতে আছে নিম্নবিত্তরা। কারণ বিত্তবানরা যেসব ভবনে থাকেন সেগুলো কিছুটা ভালোভাবে তৈরি করা। সেগুলোতে ঝুঁকি কম। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ যেসব ভবনে থাকেন সেগুলোতে ঝুঁকি অনেক বেশি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ অত্যান্ত জনবহুল এলাকা। এখানবার রাস্তাঘাটগুলো খুবই সরু। আমরা যদি থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের সাথে তুলনা করি তাহলে এমন একটি ভূমিকম্প বাংলাদেশে হলে তার ক্ষয়ক্ষতি হবে ব্যাপক।

আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত দেশে ছয়টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। দুই মাস পর ২১ নভেম্বর আবারো ভূকম্পন অনুভূত হলো। যার মাত্রা মাঝারি। এরপর গত তিন মাসে আরও একাধিকবার ভূকম্পন হয়। অন্যদিকে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও আশপাশের দেশগুলোতে ৫৩টি ভূমিকম্প হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ভবন ভূমিকম্প সহনশীল হলে ৯০ শতাংশ মানুষকে বাঁচানো সম্ভব যদি হয়। ঢাকা শহরে ছয় লাখ ভবন আছে।এর মধ্যে ২৫ ভাগ পেয়েছি রেড ক্যাটাগরিতে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ সূত্র জানায়, ভবন নির্মাণের সময় কংক্রিটের মান তিন হাজার পিএসআই থাকা উচিত হলেও থাকে এক হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার পিএসআই। রডের গুণগত মান থাকা উচিত ৭০ থেকে ৮০ পিএসআই। অথচ সেটা পাওয়া যায় ৪০ পিএসআই। ফলে ভবনের দুর্বলতা বেড়ে যায়।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি: কেমন ছিল ঝাঁকুনি

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: জুম্মার নামায পড়ে বের হয়ে দুবন্ধু মিলে রাস্তার উপর কথা বলতে থাকি। হঠাৎ পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠে। এর পর পরই বিকট শব্দে মাটি কেপে উঠে। এব বন্ধ মাটিতে হেলে পড়ে। আশ পাশের বাড়ি ঘর থেকে মানুষ রাস্তায় বের হয়ে আসতে থাকে। ভূমিকম্পের অনুভূতি জানাতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার ৫নং ওয়ার্ডের মেঝমিয়া এলাকার কৃষিবিদ জাহিদুল ইসলাম। একই রকম কথা বলছিলেন, কাটিয়া এলাকার গৃহবধূ রোকসানা আক্তার। তিনি জানান,‘ঘরের মধ্যে টুকটাক কাজ করছিলাম। হঠাৎ তার মনে হচ্ছিল একবার ডানদিকে, একবার তারপর বামদিকে ঢলে পড়ছি। আতঙ্কিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসি। আশপাশের কিশোর-কিশোরীসহ সর্বস্তরের মানুষ চিৎকার করতে থাকে। রোকসানা আক্তারের মতো ওই এলাকার অনেকেই ভূমিকম্পের সময় বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটাছুটি করতে থাকেন তারা। একই এলাকার বাসিন্দা জাহারুল ইসলাম টুটুল বলেন, ‘মসজিদে জুমার নামায পড়ছিলাম। দোতলা মসজিদটি দোল খাওয়া শুরু করলে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসি।’

শুক্রবার দুপুরে ভূকম্পনটি অনুভূত হয়েছে, যার উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলায়। রিকটার স্কেলে এর মাত্রা ৫ দশমিক ৪ বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। কয়েক সেকেন্ডের এ ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জেলাবাসী।

সাতক্ষীরার প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী জানান, দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিকটার স্কেলে যার মাত্রা ৫ দশমিক ৪। আর এর উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায়, যেটি খুলনার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ও সাতক্ষীরার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।

সাতক্ষীরার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানেও ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। দেশে এর আগে, গত বুধবার রাতেও ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মায়ানমারে। এটিও ছিল মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প।

খুলনা ব্যুরো

মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে খুলনাঞ্চল। এতে খুলনা, সাতক্ষীরাসহ এ অঞ্চলের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটের দিকে এ ভূকম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইএমএসসি জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৩। উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার গোসাবা থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার।

খুলনা আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়া কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, দুপুরে খুলনায় মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭।

কয়রা থেকে ইয়াসিন নামের একজন বলেন, ভূমিকম্পের সময় আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। কম্পনের ফলে পড়ে যাই।

এদিকে জুম্মার নামাজের মোনাজাতের সময় ভূমিকম্প হওয়ায় মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের কান্নার রোল পড়ে যায়। শহরের মানুষজন দ্রুত রাস্তায় নেমে আসেন।

মোংলা সংবাদদাতা : শুক্রবার দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে অনুভূত ৫ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে মোংলায় অবস্থিত চাঁদপাই পীর মেছের শাহ মাজারের প্রবেশদ্বারের একাংশ ভেঙে পড়েছে। কম্পনটি মোংলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়।

ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টার–এর তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। সংস্থাটি জানায়, কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল খুলনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে এবং সাতক্ষীরা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে অবস্থান করছিল।

রাজধানী ঢাকাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক জেলায় এই কম্পন অনুভূত হয়েছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এর কিছু এলাকাতেও, বিশেষ করে বারাসাত অঞ্চলে, কম্পন টের পাওয়া যায়।

তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে মোংলায় চাঁদপাই পীর মেছের শাহ মাজারের গেটের একটি অংশ ধসে পড়ার ঘটনা স্থানীয়ভাবে দৃশ্যমান ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।