বাংলাদেশের জন্য বিষয়টা খুশির বটে। চীনা প্রেসিডেন্ট যখন নিজে বলেন যে তিনি তার দেশের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য উৎসাহিত করবেন। একথা জানা যায় গতকাল শুক্রবার সকালের দিকে। এরপর কেটেছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। মানে সন্ধ্যার দিকে নতুন একটা খবর আসে। খবরে বলা হলো চীনা সরকার এবং দেশটির বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, ঋণ এবং অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ঢাকা নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়ে দেন যে, ত্রিশের কাছাকাছি কোম্পানির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। খবর আরও আসবে বলে আভাস দিয়েছেন কর্মকর্তারা। বলেছেন, আরও শতাধিক কোম্পানি মুখিয়ে আছে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য। এরমধ্যে বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার সকালের দিকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং’র সাথে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। কথা হয় নানা ইস্যুতে। আলোচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, পারস্পরিক সম্পর্ক রোহিঙ্গা সংকট নিরসন নিয়ে আলোচনা এবং তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনাসহ আরও কিছু দ্বি-পক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়।
গতকাল শুক্রবার সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীনকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সন্ধ্যার দিকেই ফলে গেল চীনা প্রেসিডেন্টের কথার ফল। চীনা সরকার এবং বিভিন্ন দেশটির কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ঋণ এবং অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ঢাকা নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, ত্রিশের কাছাকাছি কোম্পানির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আহ্বানে তারা চাইনিজ ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে বিনিয়োগ করবেন। এখবর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।
প্রাপ্ত তথ্য মতে চায়না বাংলাদেশের মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে ৪শ’ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। সাড়ে তিনশ’ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে চায়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনোমিক জোনে। বাকী দেড়শ’ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে কারিগরি সহায়তায়। বাকী অ্যামাউন্ট আসবে অনুদান হিসেবে। ড. ইউনূসের এই ৪ দিনের সফরকে চীন রাষ্ট্রদূত মাইলস্টোন আখ্যা দিয়েছেন। আর বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথোরিটির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ইকোনোমিক জোন অথরিটি এই সফরকে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের উত্থান করতে পারে বলে অভিহিত করেন।
প্রসঙ্গত চীনা প্রেসিডেন্ট শিজিমপিংয়ের সাথে বৈঠকের সময় চীনা প্রেসিডেন্ট ড. ইউনূসকে বাংলাদেশে তার দেশের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য গ্রীণ সিগন্যাল দেন। তিনি জানান, তার দেশের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করবেন। এতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশে চীনা কোম্পানিগুলো বড় বড় বিনিয়োগ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আশিক চৌধুরী কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন শতাধিক চায়নিজ কোম্পানি এরমধ্যে বিশ্বের নামকরা কিছু কোম্পানি রয়েছে তারা বাংলাদেশে উৎপাদনকেন্দ্রীক বিনিয়োগ করবে। বিশেষ করে এডভান্সড টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে বিনিয়োগের আগ্রত দেখিয়েছে। ব্রিফিংয়ে তারা তিন দফা মিটিং করেন।
শিজিনপিংয়ের সাথে ড. ইউনূসের মিটিং : সকালে অধ্যাপক ইউনূস তার বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। বাংলাদেশে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থান 'নতুন বাংলাদেশ' গঠনের পথ সুগম করেছে। চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি সেখানে গ্রামীণ ব্যাংক ও সামাজিক ব্যবসার প্রচলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বৈঠকের সময় তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেন এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনে চীনের শক্তিশালী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজ নিজ পক্ষের নেতৃত্ব দেন। প্রধান উপদেষ্টা বর্তমানে চার দিনের চীন সফরে রয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, শি জিন পিং এর সাথে মিটিংটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এবং পুরো মিটিংজুড়ে হৃদ্যতা ছিল। তাতেই বোঝা যায় চীন বাংলাদেশের সাথে খুব আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়তে চায়। তিনি জানান, প্রফেসর ইউনূস মিটিং বাংলাদেশের সাথে চীনের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে তা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে চীনের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর। এছাড়া চীনের সাথে অন্যান্য যে ইস্যুগুলো আছে তা উল্লেখ করেছেন। মূলত আমরা চীনের সমর্থন চাচ্ছি। মজার বিষয় হলো প্রতিটি বিষয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট সি বলেছেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে তারা পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে।
তিনি বলেন প্রফেসর ইউনূসের চীন সফরের মূল উদ্দেশ্য চীনা ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আমন্ত্রণ জানানো। বিষয়টি দ্বি-পক্ষীয় বৈঠকে উপস্থাপন করেছেন। এক্ষেত্রে শিজিনপিং বলেছেন তিনি তার দেশের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবেন।
এছাড়া প্রস্তাবিত তিস্তা ব্যারেজ ম্যানেজমেন্ট নিয়েও বৈঠক আলোচনা হয়েছে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানান, তিস্তা প্রকল্পের সাহায্যের বিষয়টাও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক সামনে আরও গতি পাবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পর খুব দ্রুত চাইনিজ ইকোনোমিক জোনের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, একারণে চীনা বিনিয়োগকারীরা প্রচুর বিনিয়োগ শুরু করবেন। মূলত চীনা ব্যবসায়ীরা তাদের সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে যে তাদের সরকার কি বলে। আজকে প্রেসিডেন্ট শিজিনপিং যেহেতু বলেছেন যে তিনি তার দেশের ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করবে। আমরা প্রত্যাশা করছে চাইনিজ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকহারে বাংলাদেশে আসবে। এই বিনিয়োগের সাথে চাকুরীর বাজার জড়িত। এখানে যত বিনিয়োগ হবে তত বাংলাদেশের মানুষের চাকুরীর বাজার তৈরি হবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। প্রফেসর ইউনূস চাচ্ছেন খুব দ্রুত কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে। চাইনিজরা মংলা বন্দরের কাছেও বিনিয়োগ করতে চায়। চীনা প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন যে তিনি বাংলাদেশের আম এবং কাঁঠাল খেয়েছেন। তাই প্রত্যাশার কথা হলো আগামি জুন জুলাইয়ে আমের সেশনে আম কাঁঠাল রফতানির শুরু হবে।
এদিকে চীন সফরের দ্বিতীয় দিনে অধ্যাপক ইউনূস বেইজিংয়ের দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল-এ চীনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বিনিয়োগ সংলাপে অংশ নেন। বাংলাদেশের ব্যবসার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি চীনা বিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আপনারা (চীনা বিনিয়োগকারীরা) বাংলাদেশের ব্যবসার সম্ভাবনার সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন’। এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সম্পর্কে চীনা বিনিয়োগকারীদের ধারণা প্রদান এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
সরকার প্রধান উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। এছাড়া, বাংলাদেশ এমন একটি চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে যেখানে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বড় বড় নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের কথা উল্লেখ করে তিনি বাণিজ্য ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সমুদ্রের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, নেপাল ও ভুটান স্থলবেষ্টিত দেশ, যাদের কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যও স্থলবেষ্টিত। আমাদের ছাড়া তাদের বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই। আমরা এই অঞ্চলের অবিভাবকের মতো। তিনি এসব দেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ওপর জোর দেন, যা বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের মানব সম্পদের সম্ভাবনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ এবং প্রতি বছর আরো ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ড. ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ বাস করে। যাদের বেশিরভাগই যুবক। যারা উদ্যম, সৃজনশীলতা ও উচ্চাকাক্সক্ষায় পরিপূর্ণ। প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর অভাব নেই- পুরুষ এবং নারীরা সমানভাবে অংশগ্রহণ করছে’। বাংলাদেশের রূপান্তর প্রসঙ্গে সরকার প্রধান বলেছেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি এক সম্পূর্ণ নতুন দেশে পরিণত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, দেশে নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে, যা ব্যবসা ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বক্তৃতা করেন।
প্রধান উপদেষ্টা একই ভেন্যুতে আরও দুটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন, যার বিষয়বস্তু হলো টেকসই অবকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগ, বাংলাদেশ- উৎপাদন ও বাজারের সুযোগ এবং সামাজিক ব্যবসা, যুব উদ্যোক্তা ও থ্রি জিরো বিশ্বের ভবিষ্যৎ। বৈঠকে তিনি বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সামাজিক ব্যবসা ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, চীনের স্বনামধন্য কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। অধ্যাপক ইউনূস চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের আয়োজনে এক নৈশভোজেও অংশ নেন।
এদিন তিনি চীন কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি)-এর ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াও ওয়াং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
এই সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন- পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।