এলপি গ্যাসের বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে সারা দেশে দফায় দফায় অভিযান পরিচালনা করছে ভোক্তা অধিকার ও জেলা প্রশাসন। গত কয়েক দিন ধরে বাজারে বেসামাল বাড়তি দামে এলপি গ্যাস বিক্রির কারনে চরম দুর্ভোগে পড়ে গ্রাহকরা। বিশেষ করে জ¦ালানি কাজে অপরিহার্য এলপি গ্যাস বাড়তি দামে কিনতে গিয়েও হয়রানির শিকার হচ্ছে মানুষ। এমন হাজারো অভিযোগ পেয়ে অভিযান শুরু হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকারি উদ্যোগে এলপিজি উৎপাদন না বাড়ায় বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি ও সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে বাজার ও দাম নির্ধারণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই।

এদিকে বাড়তি দামে এলপি গ্যাস কিনতে গিয়ে মানুষ যখণ চরম বিড়ম্বনায় ঠিক তখনই এলপি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। রোববার জানুয়ারি মাসের এলপি গ্যাসের দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। নুতন দাম অনুযায়ি প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ২৫৩ টাকা থেকে ৫৩ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া অটোগ্যাসের দাম ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা থেকে দুই টাকা ৪৮ পয়সা বাড়িয়ে ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে নুতন দাম কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। এর আগে ডিসেম্বর মাসে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি অটোগ্যাসের দাম এক টাকা ৭৪ পয়সা বাড়িয়ে ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।

দাম ঘোষণার পর সরকার নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস কেনার নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি বলেছেন, নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ভোক্তা গ্যাস কিনতে পারবে এ নিশ্চয়তা কমিশনের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

বিইআরসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, কমিশন যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, ভোক্তা ঠিক সেই দামেই পণ্য কিনতে পারবেএ বিষয়টি নিশ্চিত করা কঠিন। এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সব ধরনের ব্যয় হিসাব করেই দাম নির্ধারণ করা হয়। অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, তারা নির্ধারিত মূল্যেই পণ্য সরবরাহ করছে। এ ছাড়া উচ্চমূল্য রোধে অভিযান চালাতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এলপিজি আমদানিতে জাহাজ সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে জালাল আহমেদ বলেন, মূলত মধ্যপ্রাচ্যগামী জাহাজের ক্ষেত্রেই সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি এলসি ইস্যু নিয়েও জটিলতা আছে। অনেক ক্ষেত্রে এলসি খোলা হলেও পণ্য আনা যাচ্ছে না। তবে এলসি খোলার ক্ষেত্রে কেউ জটিলতায় পড়লে, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এলসি ইস্যু নিয়েও সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো এলসি খুলতে পারছে, কিন্তু পণ্য আনতে পারছে না। এরপরেও যদি কেউ এলসি খোলা নিয়ে জটিলতায় পড়ে, সেক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

সূত্র জানায়, বাজারে প্রধান এলপিজি কোম্পানিগুলোর তালিকা রয়েছে, বসুন্ধরা এলপি গ্যাস,ওমেরা এলপিজি, যমুনা গ্যাস,বিএম এনার্জি, টোটালগ্যাস,লাফস গ্যাস,নাভানা এলপিজি লি: বেক্সিমকো এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি জেএমআই এলপিজি ইউনি গ্যাস ,মেঘনা গ্যাস ,ইনডেক্স এলপি গ্যাস , অরিয়ন গ্যাস লিমিটেড , ফ্রেশ এলপি গ্যাস

সূত্র জানায়,গত দুই দশকে এলপিজির ব্যবহার কয়েকগুণ বাড়লেও এখনও বছরে মাত্র ২০ হাজার টন এলপিজি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ সরকার। অথচ বর্তমানে দেশে এলপিজির ব্যবহার বছরে ১৫ লাখ টন।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এলপি গ্যাস নামে সরকারের একটি কোম্পানি আছে। বছরে সেখান থেকে ২০ হাজার টন বোতলজাত গ্যাস উৎপাদন করা হয়। আবার সেই গ্যাসের ৮০ শতাংশই সরকারের একটি বাহিনীকে সরবরাহ করা হয়। বাকি ২০ শতাংশ ডিলাররা পান, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এদিকে গত দুই দশকে দেশে এলপিজির বাজার বছরে ১৫ লাখ টনে পৌঁছেছে। এ খাতে ৫৮টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিলেও মাত্র ২৭টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এলপিজি অপারেটর হিসেবে কাজ করছে।

ঢাকার কেরানীগঞ্জে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সরকার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দামে এলপিজি গ্যাস বিক্রির অভিযোগে মোবাইল কোর্টপাঁচটি মামলায় পাঁচ ব্যবসায়ীকে মোট ৩২ হাজার টাকা অর্থদন্ড দেওয়া হয়েছে।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. উমর ফারুক বলেন, অবৈধভাবে মজুদকৃত এলপিজি গ্যাস বা সরকার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া মাত্রই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

ফেনী সদরের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি রোধে তদারকি অভিযান পরিচালনা করা হয়। শনিবার খাজুরিয়া এলাকার এলপিজি গ্যাস পরিবেশক মেসার্স ইস্টার্ন ট্রেডিং কর্পোরেশনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার তারাগঞ্জ সদর বাজারে অতিরিক্ত মূল্যে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগে দুইটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

অতিরিক্ত দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি রোধে কুমিল্লায় অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অভিযানে দুই প্রতিষ্ঠানকে মোট ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শনিবার জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কুমিল্লা জেলা কার্যালয়ের উদ্যোগে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পদুয়ার বাজার এলাকার এলপিজি গ্যাস পরিবেশক মেসার্স সরকার এন্টারপ্রাইজকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অপরাধে চাষাপাড়া এলাকার মেসার্স উজ্জ্বল ট্রেডার্সকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অধিক দামে গ্যাস বিক্রি ও ওজনে কম থাকার কারণে মেসার্স জেনারেল গ্যাস হাউজ নামে এক গ্যাস ডিলারকে জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ মাগুরা অফিস। রবিবার মাগুরা শহরের দোহারপাড় এলাকায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাগুরা জেলা কার্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে মেসার্স জেনারেল গ্যাস হাউজ নামে একটি ডিলার প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। এসব অপরাধের দায়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক সৈয়দ খায়রুজ্জামানকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ছেংগারচর বাজারের বিভিন্ন এলপিজি গ্যাসের গোডাউনে অভিযান পরিচালনা করা হয়।অবৈধভাবে গ্যাসের সিলিন্ডার মজুদ রাখায় দোকানিকে দশ হাজার টাকা জরিমানা করে মোবাইল কোর্ট। শনিবার অভিযান্ েদশ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করা হয়।

নোয়াখালীর সদর উপজেলায় বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রোববার সকালে উপজেলার দত্তবাড়ি মোড় এলাকার এলপিজি গ্যাস পরিবেশক মেসার্স নীড় এন্টার প্রাইজে এই অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবৈধভাবে গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে আবুতোরাব ও বড়তাকিয়া বাজারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোমাইয়া আক্তারের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়।

ক্যাবের জ¦ালানি উপদেস্টা অধ্যাপক শামসুল আলম দৈনিক সংগ্রামকে জানান , অবশ্যই বাজারে দাম বৃদ্ধির জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা জড়িত। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে নির্ধারিত দাম কার্যকর করা যাচ্ছে না। নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে এবং এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আর এর দায় নিতে হবে বিইআরসিকেই।

এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা : জ্বালানি মন্ত্রনালয়

এদিকে বর্তমানে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশনা প্রদান করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গতকাল রোববার বিকাল ৩টায় জ্বালানি বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠকে এসিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য কেবিনেট ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। অভিযানের ফলে এল পি জির দাম দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে জানায় মন্ত্রনালয়।

মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এলপি গ্যাসের বাড়তি দাম নেয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট বিভাগের সচিব ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণকে নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে পরিস্থিতি বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে এলপিজির বাজার স্বাভাবিক করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এলপিজি অনার্স এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ এবং এলপিজি অপারেটরদের সাথে বৈঠকে চলমান এলপিজি সংকট বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।