রয়েছে নৌ-বিমানবাহিনর ৯ হাজার সদস্য

মাঠে আছে ৩৭ হাজারেরও অধিক বিজিবি সদস্য

নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো ধরনের শঙ্কা নেই: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরতৎপরতা শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে লক্ষাধিক সেনাসদস্যের আনুষ্ঠানিক টহল শুরু হয়েছে।

যদিও আগে থেকে প্রায় ৪০ হাজার সেনাসদস্য সারাদেশে মোতায়েন ছিল। সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভোট সুষ্ঠু করতে জোরৎপরতা চালাচ্ছেন। এবারের নির্বাচনকে চ্যালঞ্জ হিসেবে নিয়েছে সরকার। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

এরআগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের সভায় বলা হয়েছে- এবার রেকর্ড সংখ্যক প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ৭ দিনের জন্য তারা মাঠে থাকবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট ঘিরে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকছে। গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকবে। ভোটের চারদিন আগে, ভোটের দিন ও পরবর্তী দুইদিন মিলিয়ে মোট সাতদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে বলে জানান তিনি। ভোটের পরিবেশ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা মনেকরি নির্বাচনের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভালো আছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ব্যালট বাক্স জেলায় জেলায় পাঠানো হচ্ছে। রিটার্নিং কর্মকর্তারা সেগুলো গ্রহণ করছেন। সংশ্লিষ্ট সবাই এখন ভোটের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী সাতদিন দায়িত্ব পালন করবে এবং আনসার বাহিনী থাকবে আটদিন। পুলিশ ও সেনাবাহিনী অলরেডি মাঠে রয়েছে। ইসি সচিব জানান, ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোতায়েন (ডেপ্লয়েড) থাকবেন। মূলত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য তাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এ সময় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদেরও মাঠে রাখা হবে। এছাড়া ইলেক্টোরাল এনকোয়ারি অ্যান্ড এডজুডিকেশন কমিটি ইতোমধ্যে মাঠে কাজ করছে। ইসি সচিব আরও জানান, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায় বন্ধ হবে।

এর আগে গত ২২ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুষ্কৃতকারীদের ব্যালট ছিনতাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। অতীতের নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একজন করে অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করলেও এবার প্রথমবারের মতো প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কমপক্ষে পাঁচজন অস্ত্রধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে দুইজন অস্ত্রধারী পুলিশ ও তিনজন অস্ত্রধারী আনসার সদস্য থাকবেন। গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে তিনজন অস্ত্রধারী পুলিশসহ মোট ছয়জন অস্ত্রধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে অস্ত্রবিহীন (লাঠিসহ) ১০ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে, যাদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ ও চারজন নারী। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন, যা একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের শতভাগ সততা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিএনসিসি, গার্লস গাইড ও স্কাউট সদস্যরাও নির্বাচনে সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে দুই ধাপে বাহিনী মোতায়েন করা হবে। প্রথম ধাপে যারা বর্তমানে মোতায়েন আছেন, তারা দায়িত্বে থাকবেন। দ্বিতীয় ধাপে ভোটকেন্দ্রিক মোতায়েন কার্যক্রম পরিচালিত হবে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাতদিন দায়িত্ব পালন করবেন।

ভোটকেন্দ্র দখল হলে ব্যবস্থা: নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ও ব্যালট বাক্স দখল হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলিস্তানের জাতীয় স্টেডিয়ামে অবস্থিত সেনাক্যাম্পে এক ব্রিফিংয়ে সেনা সদরের ডিরেক্টর (মিলিটারি অপারেশন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মনজুরুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি জানান, অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে এই নির্বাচনে বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাপ্রধানের দিকনির্দেশনায় অসামরিক প্রশাসন ও জনগণকে সাহায্যের জন্য অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সেনাবাহিনী সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। কেউ ভোটকেন্দ্র দখল করতে চাইলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোট সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে এক লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সেনাসদর। আগের নির্বাচনে যেখানে সর্বোচ্চ ৪০-৪২ হাজার সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দূরবর্তী এলাকায় অবস্থান করতেন, সেখানে এবার প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত টহলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাতায়াত ও আস্থা ফিরিয়ে আনতেই বাড়তি এই মোতায়েন জোরদার করা হয়েছে, যা ২০ জানুয়ারি থেকে কার্যকর রয়েছে।

নৌ-বিমানবাহিনর ৯ হাজার সদস্য: সেনাসদর থেকে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনী ৫ হাজার এবং বিমান বাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ জন সেনা মোতায়েন করেছে। সেনাবাহিনী সারাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলায় ৪১১ টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে সর্বমোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল যৌথ অভিযান এবং আমরা চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রেখেছে। বিজিবি পুলিশ আনসারের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েনের যে দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যাচ্ছে একদিকে অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। যার অধিকাংশই বিদেশি পিস্তল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং দুষ্কৃতিকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। এক প্রশ্নের উত্তরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মনজুরুল ইসলাম বলেন- ভোটের পরেও সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে। তবে সেনাবাহিনী কতদিন মাঠে থাকবে তা নির্ভর করে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে সরকারের নির্দেশে এবং মাঠ থেকে ফিরবেও সরকারের নির্দেশনায়।

মাঠে রয়েছে ৩৭ হাজারেরও অধিক বিজিবি সদস্য: এর আগে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পারস্পরিক সামান্য ও দায়িত্ব বণ্টন এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সকলকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। এসময় তিনি বলেন, দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ রেখেই সারা দেশে ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টি উপজেলায় ৩৭ হাজারেরও অধিক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়াও সারাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ঝুঁকি বিবেচনায় বিজিবি মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।

নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো ধরনের শঙ্কা নেই : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো ধরনের শঙ্কা নেই। গতকাল রোববার দুপুরে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের এ বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনটা শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে হবে। আপনারা সহযোগিতা করবেন, কোথাও যদি কোনো রকম কারচুপি হয় আমাদের জানাবেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন নেব। তিনি বলেন, নির্বাচন খুব শান্তিপূর্ণভাবে, সুষ্ঠু পরিবেশে এবং একটা উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হবে। একটা ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল নির্বাচন হবে। বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, যে জায়গায় যে রকম ব্যবস্থা নেওয়ার, ওই ধরনের প্রস্তুতি আমাদের নেওয়া হয়েছে।