কিছুটা কম দামে ঈদের পোশাক কিনতে রাজধানীর গাউছিয়া ও নিউমার্কেট এলাকায় ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার প্রথম দু‘দিনের গতকাল বুধবার অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এ দুটি মার্কেটে কেনাকাটা সেরেছেন। তবে গতবারের তুলনায় এ বছর পোশাকের দাম বেশি বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা।
গাউছিয়া ও নিউমার্কেটের বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, শেষ সময়ে এখন তরুণ-তরুণীরা পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে অলংকার, ওড়না-হিজাব, পায়জামা, জুতা, চুড়ি, কানের দুল, আংটিসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক সামগ্রী কিনছেন।
গতকাল দুপুরের আগেই গাউছিয়া ও নিউমার্কেট এলাকায় যেন মানুষের ঢল নামে। গাউছিয়া মার্কেটে কথা হয় পলাশী এলাকার গৃহিণী জেসমিন আক্তারের সঙ্গে। তিনি অষ্টম শ্রেণি ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়ুয়া দুই মেয়েকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছেন। বলেন, মেয়েরা একটু বড় হয়েছে। চকচকে পোশাক পছন্দ করে; কিন্তু যেটাই ধরি, দাম চায় ছয়-সাত হাজার টাকা। বলে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি। কিন্তু আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার, সেই সামর্থ্য নেই। বাচ্চাদেরও বোঝানো যায় না। তারা বান্ধবীদের কাপড় দেখে দামিগুলো কিনতে চায়। এর আগে চার দিন এসেছি; কিন্তু দাম বেশি থাকায় কিনতে পারিনি। দাম বেড়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় আড়াই হাজার ও তিন হাজার টাকা দিয়ে মেয়েদের জন্য দুই সেট থ্রি-পিস কিনেছি।
বেসরকারি চাকরিজীবী হাবিব রহমান স্ত্রী ও ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে নিউমার্কেটে এসেছিলেন। তার অভিযোগ, গতবার বাচ্চাদের যে কাপড়ের দাম ছিল ৭০০-৮০০ টাকা, তা এবার ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না।
বাচ্চাদের পোশাক বিক্রি বেশি : দাম বেশি হলেও গত ঈদের তুলনায় এবার বাচ্চাদের পোশাক বিক্রি ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। মেয়েশিশুদের ওয়ান-পিস, টুপিস এবং ছেলেদের প্যান্ট-শার্ট ও গেঞ্জির কাটতি বেশি। ওই এলাকার নূরজাহান মার্কেটের পলি ফ্যাশনে মেয়েদের ওয়ান পিস বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। টু–পিসের দাম পড়ছে ৩০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। আর দুই থেকে আড়াই শ টাকায় বিক্রি হয় পালাজ্জো। এখানকার বিক্রেতা মো. শরিফ জানান, প্রতিদিন তাদের ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকার পোশাক বিক্রি হয়। বাচ্চাদের কাপড়ের বিক্রি ভালো। চাঁদরাতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হবে বলে তার আশা।
গাউছিয়া মার্কেটের শতরূপা নামের দোকানে দেশীয় ও ভারতীর পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। তারা ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার বেশি দামে থ্রি-পিস বিক্রি করে। এর মধ্যে পাথরের কাজ করা ফারসি নামের পোশাক বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে বলে জানান দোকানটির মালিক আবিদা ইসলাম। দিনে দুই লাখ টাকার বেশি পোশাক বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে কাপড়ের দাম বাড়তি থাকায় শুধু মেয়ের জন্য কাপড় কিনবেন একটি অফিসের কর্মচারী খালেক মিয়া। ডেমরা থেকে আসা এই ক্রেতা সকাল থেকেই ঘুরে ঘুরে দাম দেখেছেন। দুপুর পর্যন্ত কিনতে পারেননি।
শাড়ির দোকানে ভিড় কম : ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটে সব ধরনের শাড়ি পাওয়া গেলেও ক্রেতারা দেশি জামদানি শাড়ির জন্য এখানে ভিড় করেন বেশি। রোজার মাঝামাঝি বেশি বিক্রি ছিল বলে জানান বিক্রেতারা। এখনো বিক্রি হচ্ছে, তবে আগের চেয়ে কম। এ মার্কেটের নিউ জামদানি কুটিরে ৬ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় জামদানি শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রেতা মো. সিয়াম জানান, প্রতিদিন ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার মতো বিক্রি হয়। তবে প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি বিক্রির।
মেয়েকে নিয়ে রামপুরা থেকে আসা আসিয়া বেগম ৩ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে দুটি থ্রি-পিস কিনেছেন বলে জানান।
পোশাক কেনার পরে শেষ সময়ে অনেকে এখন আনুষঙ্গিক পণ্য কিনছেন। প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টারের অগ্রণী হিজাব ম্যাচিংয়ের মালিক মো. সালাহউদ্দীন জানান, তারা সুতি, জর্জেট ও চীনা সিল্ক কাপড় দিয়ে তৈরি হিজাব, স্কার্ফ ও ওড়না ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেন। দৈনিক ৪০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়। এদিকে ফতপাতে দোকানগুলোতেও বিক্রি বেশ জমেছে। হাঁকডাক দিয়েই বিক্রি করছে তারা। মামুন মিয়া নামের তেমনই এক বিক্রেতা জানান, তিনি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় পায়জামা বিক্রি করছেন। দিনে ১০০ থেকে ১৫০ পিস পায়জামা বিক্রি হচ্ছে। ৪০০ টাকা গড় দাম ধরলে তার দৈনিক বিক্রি ৬০ হাজার টাকার মতো।
মার্কেটের পাশাপাশি ফতপাতের দোকানগুলোতেও ঈদ উপলক্ষে স্যান্ডো গেঞ্জি এবং শর্ট প্যান্টের বিক্রি বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। এ ছাড়া পুতুলও বিক্রি হচ্ছে। এ নিয়ে ফতপাতের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম জানান, ঈদ উপলক্ষে এখন দিনে ৫০টির বেশি পুতুল বিক্রি হয় তার। এসব চায়নিজ পুতুলের একেকটির দাম ১৫০ টাকার মতো। তার দোকান থেকেই এক মা পুতুল কিনে দেওয়ায় দারুণ খুশি দেখা গেল শিশু জান্নাতুল ফেরদৌসকে।
রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহীর মার্কেটগুলোতে চলছে শেষ সময়ের ঈদের কেনাকাটা। মহানগরী ছাড়াও আশেপাশের উপজেলাগুলো থেকে আসা মানুষের ভিড়ে জমজমাট বিপণিবিতানগুলো।
ঈদুল ফিতরকে ঘিরে রাজশাহী নগরীতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। শেষ মুহূর্তের এই কেনাকাটাই যেন ঈদের আনন্দকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে নগরবাসীর মাঝে। গতকাল নগরীর প্রধান বিপণিবিতান, মার্কেট ও অস্থায়ী হাটগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে কেনাকাটায় ব্যস্ত তারা। বিশেষ করে পোশাকের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের চাপ সবচেয়ে বেশি। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণী ও বয়স্কদের জন্য নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাক কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ক্রেতারা। বিক্রেতারাও ক্রেতাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক দোকান রাতভর খোলা রাখার প্রস্তুতিও নিয়েছে।
তবে শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ নেই কেনাকাটা। ঈদের প্রধান খাদ্যদ্রব্য সেমাই, চিনি, দুধ, ঘি ও বিভিন্ন ধরনের মশলার দোকানগুলোতেও ব্যাপক ভিড় দেখা যাচ্ছে। খুচরা ও পাইকারি বাজারে সেমাইয়ের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। লাচ্ছা সেমাই, চিকন সেমাই ও প্যাকেটজাত সেমাই কিনতে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মত। মশলার দোকানগুলোতেও একই চিত্র। গরম মশলা, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গসহ বিভিন্ন উপকরণের বিক্রি বেড়েছে। অনেকেই ইদের দিনের রান্নার প্রস্তুতি হিসেবে আগেভাগেই এসব উপকরণ কিনে নিচ্ছেন। বিক্রেতারা জানান, ইদের আগের দুই-তিন দিনে মশলা ও সেমাইয়ের বিক্রি সবচেয়ে বেশি হয়। অন্যদিকে, গরু ও মুরগির মাংস, ডিম, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের বাজারেও ক্রেতাদের চাপ রয়েছে। অনেকেই ঈদের দিন ও পরবর্তী কয়েকদিনের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার কিনছেন। ক্রেতারা জানান, শেষ মুহূর্তে এসে ভিড় বেশি হলেও ঈদের আনন্দকে ঘিরে এই কেনাকাটা তাদের জন্য বাড়তি উচ্ছ্বাস তৈরি করছে। তবে অতিরিক্ত ভিড় ও যানজট কিছুটা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে যাতে করে ক্রেতারা নির্বিঘেœ কেনাকাটা করতে পারেন। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রস্তুত রয়েছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম ব্যুরো
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় চট্টগ্রামে জমে উঠেছে মুদি দোকানগুলো। বিশেষ করে সেমাই, চিনি, দুধ, ঘি, ময়দা, সুজি, কিশমিশ, বাদামসহ নানা খাদ্যপণ্য কিনতে ক্রেতাদের ঢল নেমেছে গ্রোসারি শপগুলোতে। ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়ে এখন পাড়া-মহল্লার ছোট-বড় সব মুদি দোকানই পরিণত হয়েছে ব্যস্ততম কেন্দ্রে। চট্টগ্রাম শহর ও জেলার গ্রামীণ হাট-বাজারে একই চিত্র দেখা গেছে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় দোকানের সামনে লাইন ধরে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষরা অফিস শেষে সন্ধ্যার পর কেনাকাটায় বের হওয়ায় তখন ভিড় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের দিন সকালে ঘরে ঘরে সেমাই রান্না একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তাই সেমাই ও চিনির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এর পাশাপাশি দুধ, ঘি, এলাচ-দারুচিনি, কিশমিশ, বাদাম, নারিকেল, এমনকি পোলাও চাল ও মাংসের উপকরণও কিনছেন অনেকে। অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি হিসেবে এসব কেনাকাটা করা হচ্ছে। একজন গৃহিণী জানান, “ঈদের দিন আত্মীয়স্বজন আসবে, তাই একটু বেশি করেই বাজার করছি। সেমাই, চিনি, দুধের পাশাপাশি বাদাম, কিশমিশও কিনেছি।” অন্যদিকে এক চাকরিজীবী বলেন, “ব্যস্ততার কারণে আগে বাজার করতে পারিনি। তাই এখন শেষ সময়ে এসে সব কিনতে হচ্ছে, ভিড়ও বেশি।”
দোকানিরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে বছরের এই সময়টিই তাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রির মৌসুম। অনেক দোকানে বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এক মুদি দোকানি বলেন, “সেমাই, চিনি, দুধ-এই তিনটা পণ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিনই নতুন করে মাল তুলতে হচ্ছে, না হলে চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।” তবে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে কিছু কিছু পণ্যের দাম বাড়ার অভিযোগও উঠেছে। ক্রেতারা বলছেন, কয়েকদিন আগের তুলনায় এখন সেমাই, চিনি ও দুধের দাম কিছুটা বেশি নেওয়া হচ্ছে। যদিও ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে, তাই খুচরা পর্যায়ে তার প্রভাব পড়ছে।
এদিকে বাজারে ভিড় বাড়ায় কিছু জায়গায় ভোগান্তিও বাড়ছে। সংকীর্ণ দোকান ও রাস্তার কারণে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। অনেক স্থানে যানজটও তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে এই বাড়তি কেনাকাটা দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করে তোলে। মুদি দোকান, পাইকারি বাজার, পরিবহন খাত-সব ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সব মিলিয়ে, ঈদুল ফিতরের আনন্দকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের এই কেনাকাটা এখন সর্বত্র এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করেছে। ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা, দরদাম, ভিড়-সবকিছু মিলিয়ে বাজারগুলো যেন ঈদের আগাম আনন্দে মুখর হয়ে উঠেছে।