রাজধানীর মেরুল বাড্ডার ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজীতে অনার্স পড়ছেন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থী নাফিজা আঞ্জুম। বাবা ও মায়ের সাথে হাত ধরে হুইল চেয়ারে বসে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে এসেছিলেন ঢাকা-১১ আসনের বাড্ডার আলাতুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। চোখেমুখে খুশির জোয়ার, আর সে জোয়ারে ভেসেই পছন্দের প্রার্থীকে ভোট আর গনভোটের অংশীদার হতে এসেছিলেন। গতকাল সকাল সোয়া ১০ টার দিকেই তাঁর দেখা মেলে ওই বিদ্যালয়ের নীচ তলায়। যেখানে ছিল ৫ টি ভোট কেন্দ্র, তাঁর একটিতে নাফিজার ভোট দেয়ার বুথ।
বিদ্যালয়ের মূল ফটক পেরিয়ে একটু ভেতরে প্রবেশ করেই দেখা যায় নাফিজার মলিন বদনখানি। এ সময় হুইল চেয়ারে বসা অবস্থায় তিনি বসা অবস্থায় হাসফাস করছেন। কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেন্দ্রের ভেতরে এসে দেখতে পান তার ভোট দেয়ার বুথটি বিদ্যালয় ভবনটির তিন তলায়। কিন্তু সিডি ভাঙ্গা ছাড়া তিন তলায় ওঠে ভোট দেয়া ছাড়া উপায় নেই। কি করবেন, এ চিন্তা করছেন নাফিজার সাথে তাঁর পিতা মাতাও। তাঁর পিতা কাজী ফজলুর রহমান জানান, মেয়ে নাফিজাকে ওপরে তোলার চিন্তা ভাবনা চলছে। এজন্য কিভাবে তাঁকে হুইল চেয়ার ছাড়া তিন তলায় নেয়া যায়, তা ভাবছেন। এর আগে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারের সাথে যোগাযোগ করেও কোন ফল না পেয়ে ওপরে নিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কোন উপায় নেই বলে জানান ফজলুর। শেষ পর্যন্ত নাফিজার পিতা ও মাতা সাথে আরও একজনকে নিয়ে হুইল চেয়ার ছেড়ে কোন মতে শূণ্যে তুলে তিন তলা পর্যন্ত নাফিজাকে নিয়ে যান। এরপর ভোট দেবার পালা। মায়ের সহযোগিতা নিয়ে বুথে ঢুকে পড়েন নাফিজা দুটো ব্যালট পেপার নিয়ে। ভোট প্রদান করে বেকর হয়ে ব্যালঠ বক্সকে মেঝে থেকে একটু ওপরে রেখে তার ভেতরে ব্যালট ফেলার ব্যবস্থাও হয়।
ভোট শেষে নাফিজা এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে খুশি, মহাখুশি। তার ভালো লাগছে। কেন্দ্র পর্যন্ত আসতে যে কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, তা এখন দূর হয়ে গেছে। এ সময় নাফিজার দাবী , সরকারকে বলবেন সামনে নির্বাচনগুলোতে যেন প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ভোটারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়। অন্তত পক্ষে নীচ তলায় ভোট দেয়ার ব্যবস্থা থাকলে এতোটা ভোগান্তি পোহাতে হতো না।
৬০ বছর বয়সী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জুলেখা ভোট দিলেন : ছোটবেলায় বসন্তরোগে আক্রান্ত হয়ে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান জুলেখা খাতুন। এখন তাঁর বয়স ৬০ বছর। ভাবি রাশেদা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গতকাল ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন। ঢাকা-১১ আসনের এ কে এম রহমত উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন জুলেখা। ভোট দেওয়ার পর এখানেই তাঁর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।
অবিবাহিত জুলেখা খাতুন বলেন, ছোটবেলায় তাঁরা বাবা মারা যান। সাড়ে ৪ বছর আগে মারা যান তাঁর মা। তাঁরা তিন ভাই-বোন ছিলেন। এক ভাই মারা গেছেন। তিনি এই আসনের পশ্চিম হারালদিয়া এলাকায় বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন। এর আগেও তিনি ভোট দিয়েছেন। এবার ভোট দিতে কে সহায়তা করলেন, জানতে চাইলে জুলেখা খাতুন বলেন, তিনি তাঁর ভাবির সঙ্গে কেন্দ্রে আসেন। তাঁর ভাবিই তাঁকে ভোট দিতে সহায়তা করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় জুলেখা খাতুনকে ভোট দিতে সারি ধরতে হয়নি। তাঁর হয়ে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করেন ভাবি রাশেদা বেগম। দুজন একই সঙ্গে কাপড়েঘেরা গোপন কক্ষে প্রবেশ করেন। ভোট দেওয়া শেষে ব্যালট পেপার রাখেন ব্যালট বক্সে।
ভাবি রাশেদা বলেন, ভোট দিতে তিনি আগেও জুলেখা খাতুনকে কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। আজ একটি রিকশা নিয়ে তাঁরা কেন্দ্রে আসেন।
ঢাকা ১৩ আসনের জেন-জি ভোটকক্ষ : ঢাকা ১৩ আসনে মোহাম্মদপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি ভোটকক্ষকে জেন-জি কক্ষ হিসেবে বর্ণনা করেন সেখানকার প্রিজাইডিং কর্মকর্তা। দুপুর একটা নাগাদ সেই কক্ষের বাইরেই বেশ লম্বা লাইন দেখা গেছে। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রেই কিছু পোলিং এজেন্ট দেখা গেছে যারা তরুণ শিক্ষার্থী। এর বাইরে মোহাম্মদপুরের ছয়টি ভোটকেন্দ্র ঘুরে সকালের দিকে নারী ভোটার উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে পুরুষ ভোটারের লাইনও বেড়েছে। এসব জায়গায়ও তরুণরা খুব আগ্রহ নিয়ে ভোট দিতে আসেন। বড় ভোটকেন্দ্রগুলির বাইরে সেনাবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ছিল।