চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এর মাধ্যমে মামলার যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এখন রায়ের জন্য প্রস্তুত। যেকোনো দিন এ মামলার রায় ঘোষণা হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল গতকাল মঙ্গলবার এ আদেশ দেন । প্যানেলের অন্য সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে জবাব দেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। এরপর পাল্টা জবাব দেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। যুক্তি-পাল্টা যুক্তি খ-ন শেষে রায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন ধার্য করেননি ট্রাইব্যুনাল। ফলে যেকোনো দিন এ মামলার রায় ঘোষণা হবে।

ট্রাইব্যুনালে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা। আসামিপক্ষে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু, আবুল হাসানসহ অন্যরা ছিলেন।

আবু সাঈদের মৃত্যু নিয়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের হত্যাকা-কে ভিন্নখাতে নিতে চেয়েছিল তৎকালীন সরকার। এজন্য হত্যাকারীরা নিজেদের রক্ষার স্বার্থে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছিলেন। সাক্ষ্যপ্রমাণ বিনষ্ট করতে নিজেদের মতো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন তারা। এ ছাড়া, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন বারবার পরিবর্তন করতে চিকিৎসককে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মৃত্যুর সঠিক কারণ জাতির সামনে তুলে ধরেছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রাজিব। মৃত্যুর কারণ পরিবর্তন করেননি তিনি। ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্যও দিয়েছেন।

প্রসিকিউটর মিজানুল বলেন, এ মামলায় আমরা ২৫ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছি। সব আসামির বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ দিতে সক্ষম হয়েছি। রায়ের জন্য অপেক্ষমান রেখেছেন ট্রাইব্যুনাল। আশা করছি খুব শিগ্গিরই এ মামলার রায় পাব।

আসামিপক্ষের দাবি অনুযায়ী, আবু সাঈদের গেঞ্জি বা টি-শার্টে গুলির বা ছিদ্রের চিহ্ন ছিল নাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ট্রাইব্যুনালে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছি। আপনাদের জ্ঞাতার্থে এটুকু বলতে পারি যে, যে আলামত সংগ্রহ বা জব্দ করা হয়েছিল, এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অর্থাৎ যে মামলায় আবু সাঈদদেরকে আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়েছে সেই মামলায় নয়। মূলত তাকে আক্রমণকারী চিহ্নিত করতে যে মামলা করা হয়েছিল, সেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সরকারের অনুগত হয়ে একটা অংশ জব্দ করেছিলেন। এটা পেছনের অংশ হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তার বুকে ও পেটে গুলি লেগেছিল। পেছনের অংশ জব্দ করার উদ্দেশ্যই ছিল মামলাকে প্রভাবিত করা। এ ছাড়া, মাথার আঘাতে আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছিল বলে প্রচার করেছিল তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার। আর সেই কথাকে প্রমাণ করতে এটা করা হয়েছে। আমরা এই তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেব।

এর আগে গত ২১ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় ২৫ জানুয়ারি। তিন কার্যদিবসে যুক্তিতর্কে এ মামলার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া বেরোবি ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সিসিটিভি ফুটেজ ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়, যা ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যাকা-ের সময় ধারণ করা হয়েছিল। মামলার প্রমাণ হিসেবে দেখানো এসব ভিডিওতে আসামিরা কে, কোথায় ছিলেন বা তাদের কার্যকলাপ শনাক্ত করে দেন প্রসিকিউটর মিজানুল। সবশেষে ৩০ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে প্রসিকিউশন।

এরপর আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো, আজিজুর রহমান দুলু, আবুল হাসানসহ স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা। তারা তাদের মক্কেলদের বেকসুর খালাস চেয়েছেন।

এদিকে, গতকাল সকালে কারাগার থেকে এ মামলার ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন, এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ। তবে বেরোবির সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ২৪ জন এখনো পলাতক।

আদালত সূত্র জানায়, পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা মামলার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের ৬ আগস্ট, সেদিন ট্রাইব্যুনাল ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। এর আগে ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় এবং ২৭ আগস্ট প্রসিকিউশন সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে আন্দোলন চলাকালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া সাঈদের সেই ভিডিওটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

মামলার সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাই রংপুর নগরীর লালবাগ এলাকা থেকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে বিক্ষোভ মিছিল এগিয়ে এলে অসংখ্য সশস্ত্র পুলিশ রাজপথে শিক্ষার্থীদের বাধা দেন। একপর্যায়ে রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের পাঁচ সদস্য স্টিল ও কাঠের লাঠি দিয়ে আবু সাঈদের মাথায় আঘাত করেন এবং তাঁর মাথা দিয়ে রক্ত বের হয়।

সেদিন দুপুরে পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন প্রথমে আবু সাঈদকে গুলি করেন উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম বলেন, প্রথম গুলিটি যখন আবু সাঈদের পেটে লাগে, তখন তিনি হতবাক হয়ে যান এবং আবার বুক প্রসারিত করে সেখানে দাঁড়িয়ে যান। সে সময় সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় তাঁকে পরপর দুটি গুলি করেন। এতে আবু সাঈদ সড়ক বিভাজক পার হয়ে বসে পড়েন। আবু সাঈদকে আনতে গিয়ে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাওহিদুর হকের শরীরে প্রায় ৬০টি ছররা গুলি লাগে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে সহযোদ্ধাদের বাহুডোরে আবু সাঈদ মারা যান।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ২৪ আসামির ইচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি কিংবা বিদেশে আশ্রয় নেওয়ার ফলে বিচারপ্রক্রিয়া থেমে থাকলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতো। আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম চললেও তা ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুতি নয়। আইনের যথাযথ বিধান অনুসরণ করেই এই ট্রাইব্যুনাল অনুপস্থিত আসামিদের বিরুদ্ধেও রায় দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে আগে থেকেই ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা জানা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে তাঁর (হাসিনা) টেলিফোন কথোপকথন থেকে। শেখ হাসিনা ও মাকসুদ কামালের সেই টেলিফোন কথোপকথন ট্রাইব্যুনালকে পড়ে শোনান চিফ প্রসিকিউটর।

টেলিফোনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোন দেশে বাস করি আমরা। এদেরকে বাড়তে বাড়তে তো...রাজাকারদের কী অবস্থা হয়েছে দেখিস নাই, সবগুলাকে ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও ছাড়ব না।’ তখন মাকসুদ কামাল বলেন, ‘হ্যাঁ, এবার এই ঝামেলাটা যাক, এরপরে আমিও নিজে ধরে ধরে যারা এই অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, মেইন যারা আছে এদেরকে বহিষ্কার করব ইউনিভার্সিটি থেকে।’

এরপর শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব এইগুলাকে বাইর করে দিতে হবে...আমি বলে দিচ্ছি আজকে সহ্য করার পরে অ্যারেস্ট (গ্রেপ্তার) করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে...ইংল্যান্ডে এ রকম ছাত্ররাজনীতির জন্য মাঠে নামলে, কতগুলি মেরে ফেলায় দিলো না?’

মাকসুদ কামাল বলেন, ‘জি জি জি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অ্যাকশন না নেওয়া ছাড়া উপায় নাই। আমরা এত বেশি সহনশীলতা দেখাই...আজ এত দূর পর্যন্ত আসছে।’ ‘ফ্যাসিস্টদের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন শেখ হাসিনা’

যুগে যুগে স্বৈরশাসকের আবির্ভাব হয়েছে এবং দেশে দেশে ফ্যাসিস্টদের জন্ম হয়েছে উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন শেখ হাসিনা। আমরা তাঁর দোসরদের বিরুদ্ধেই আজ আপনাদের কাছে ন্যায়বিচার চাচ্ছি।’

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘নীলনকশার নির্বাচন, লাইলাতুল ইলেকশন আর আমি-ডামির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশের মাটিতে খুন, গুম, রাজনৈতিক নিপীড়নের যে কালচার চালু হয়েছিল, আজ তার বিচারের ফরিয়াদি আমরা। আর আপনারা তার বিচারক। আমরা চাই এই বিচার জাতির সভ্যতার সোপানে ন্যায়বিচারের মানদ- হিসেবে স্থান পাক; যাতে আগামীর বাংলাদেশে কেউ গণহত্যা চালাতে না পারে।’

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে দেখেছি স্বৈরাচার পালিয়েই শুধু যায়নি, তার ৩০০ এমপি, তার কেবিনেট, মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে সেই সকল বিচারক যারা নিজেদের শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ বলে দাবি করত, তারাও পালিয়েছে।’

এই বিচার কার্যক্রম পুরোনো রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নয়, বরং একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র একটি ন্যায়সংগত ও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তাজুল ইসলাম।

এ মামলার ১৯তম সাক্ষী শান এ রওনক বসুনিয়া তার জবানবন্দিতে বলেছেন, আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ২৬ বছর। আমি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্র। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আনুমানিক ১.৪৫টার দিকে আমি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগদান করার জন্য বাড়ি থেকে বের হই। আমার বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বেরোবির ১ নং গেটের অপরদিকে যে কাঠের ব্রিজ আছে সেটা পার হয়ে আনুমানিক দুপুর ২টার দিকে ০১ নং গেটের সামনে পৌছাই। সেখানে গিয়ে আমি দেখি যে, ০১ নং গেটের সামনে অনেক ছাত্রছাত্রী একত্রিত হয়েছে। সেখানে গিয়ে আমি জানতে পারি যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রকে ছাত্রলীগের ছেলেরা হলে আটকে রেখেছে এবং তাদের উদ্ধারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ কোন চেষ্টা করেনি। যার কারণে শিক্ষার্থীরা আটকে থাকা ছাত্রদের উদ্ধারের জন্য ১ নং গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু তখন ০১ নং গেটটি বন্ধ ছিল এবং গেটের সামনে পুলিশ দাড়িয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকতে বাধা দিচ্ছিল।

তিনি বলেন, এক সময় পুলিশ গুলি চালায় এবং লাঠিচার্জ করা শুরু করে এবং তখন আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তখন আমি ০১ নং গেটের বিপরীতে কাঠের ব্রিজের দিকে চলে আসি এবং সেখান থেকে আমি দেখতে পাই যে, কয়েকজন পুলিশ একজন কালো টিশার্ট পড়া আন্দোলনকারী ছাত্রকে মারধর করছে। আমি কিছুক্ষণ পর আবার ০১ নং গেটের দিকে যাই। ছত্রভঙ্গ হওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা তখন আবার ০১ নং গেটের সামনে জমায়েত হতে থাকে। তখন পুলিশ ০১ নং গেটের ভিতরে ক্যাম্পাসের মধ্যে অবস্থান করছিল। তখন আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা ০১ নং গেট ধাক্কাধাক্কি করে খুলে ফেলে। সে সময় আমি দেখতে পাই যে, পুলিশের সাথে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মশিউর রহমান, আসাদ মন্ডল ও নুরুন্নবী, নূর আলম, আমির হোসেন, মাহবুব, আপেলসহ আরো কিছু কর্মকর্তা কর্মচারী ও বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়–য়া, সহসভাপতি শামীম মাহফুজ, টগর, বাবুল, গ্লোরিয়াস রাব্বী, এমরান চৌধুরী, মাসুদসহ আরো কিছু বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আমাদের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। তখনই পুলিশ গুলি করতে করতে ক্যাম্পাসের ভিতর থেকে ১ নং গেট দিয়ে আন্দোলনকারীদের দিকে আসতে থাকে। এর মধ্যে ছত্রভঙ্গ কিছু ছাত্রছাত্রী কুড়িগ্রাম সড়কের দিকে যায়, কেউ লালবাগের দিকে যায়, কেউ সরদারপাড়ার দিকে যায়। কিছু কিছু শিক্ষার্থী কাঠের ব্রিজ দিয়ে সরদার পাড়ার দিকে যায়। তখন আমি বিয়াম মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেখান থেকে আমি দেখি যে, একজন আন্দোলনকারী ছাত্র পুলিশের সামনে দুহাত মেলে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখনই পুলিশ কয়েকবার গুলি চালায়।

তিনি আরো বলেন, আমি দেখি যে, সেখানে দুই হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তার ডিভাইডার পার হয়ে বসে পড়ে। তখন একজন আন্দোলনকারী ঐ ছাত্রকে ধরে দাঁড় করায় এবং নিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু তখন গুলিবিদ্ধ ছাত্রটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখন আমিসহ আরো কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে গুলিবিদ্ধ ছাত্রটিকে পার্কের মোড়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এরমধ্যে পুলিশের ছোড়া গুলি আমার কোমড়ের বাম পাশে এবং বাম পায়ের হাঁটুর নিচে লাগে। তখন আরো কিছু ছাত্রছাত্রী এগিয়ে আসে এবং গুলিবিদ্ধ ছাত্রটিকে পার্কের মোড়ে নিয়ে গিয়ে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আনুমানিক বিকেল ৩.৩০ এর সময় আমি জানতে পারি যে, সেই গুলিবিদ্ধ ছাত্রটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায় এবং তার নাম আবু সাঈদ। আমি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরেও কোথাও চিকিৎসা নিতে যাই নাই। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ১ নং গেটের সিসিটিভির বিভিন্ন ফুটেজ দেখে জানতে পারি যে, কোতোয়ালি জোনের এসি আরিফুজ্জামান, তাজহাট থানার ওসি রবিউল ইসলাম এবং বেরোবি পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় এর নির্দেশে এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় আবু সাঈদকে গুলি করে।

তিনি আরো বলেন, এই হত্যাকা-ের জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতা রয়েছে। আমি একজন ছাত্র ও সচেতন নাগরিক হিসাবে এই নৃশংস হত্যাকা- এবং এরূপ সকল হত্যাকা- ও হতাহতের ঘটনার সাথে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত তাদের সবার বিচার চাই।