নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো: সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির সুযোগে বিপুল পরিমাণ সরকারি অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ ইতোমধ্যে সংগঠিত অপরাধচক্র ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতে পৌঁছে গেছে।

সরকারি বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এর বিভিন্ন থানা থেকে ওই সময় মোট ৯৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও তৎপরতায় ৭৯৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও ১৫৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, যা দেশজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। যা আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কীভাবে লুট হলো অস্ত্র

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে থানা, ফাঁড়ি ও নিরাপত্তা চৌকি আক্রমণের মাধ্যমে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন, আবার কোথাও কোথাও জনরোষের মুখে অস্ত্রাগার রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় অস্ত্র লুট ঠেকাতে তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।

উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ও আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, যেগুলো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হলে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব অস্ত্রের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এগুলো কেবল সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র নয়-বরং সংঘবদ্ধ সহিংসতা ও ভয়ভীতি সৃষ্টিতে অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ও আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, পিস্তল, শটগান এবং গ্যাস লঞ্চার-যেগুলো খুব অল্প প্রশিক্ষণেই ব্যবহার করা সম্ভব।

নিখোঁজ অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে-৭.৬২দ্ধ৩৯ মি.মি রাইফেল (চায়না)-১৮টি, ৭.৬২দ্ধ৩৯ মি.মি এসএমজিটি-৫৬ (চায়না)-৮টি, ৭.৬২দ্ধ২৫ মি.মি পিস্তল-৫৬ (চায়না)-১৬টি, ৯দ্ধ১৯ মি.মি পিস্তল-৪২টি, ১২ বোর শটগান-৫৫টি, ৩৮ মি.মি গ্যাস গান (সিঙ্গেল শট)-১৪টি, ৩৮ মি.মি টিয়ার গ্যাস লঞ্চার (সিক্স শট)-২টি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অস্ত্র শুধু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেই নয়, বরং সংঘবদ্ধ সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরিতেও ব্যবহার হতে পারে।

নির্বাচনের আগে বড় উদ্বেগ

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সন্ত্রাসী হামলার বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অস্ত্র নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহৃত হলে তা মুহূর্তেই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।

নির্বাচনী প্রচারণা, ভোটগ্রহণের দিন এবং ফলাফল ঘোষণার পরবর্তী সময়ে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হলে জনগণের জানমালের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুধু ভোটারদের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হবে না, প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে নির্বাচনের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতাও। অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,“এই ধরনের অস্ত্র যদি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তাহলে সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়-এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সময়ে এসব অস্ত্র মানেই রক্তক্ষয়ী সহিংসতার উচ্চ ঝুঁকি।”

উদ্ধার অভিযান কেন থমকে যাচ্ছে

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উদ্ধার অভিযান ধীরগতির পেছনে রয়েছে অস্ত্র লুটকারীদের পরিচয় ও নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে ব্যর্থতা। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা। কিছু এলাকায় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় অস্ত্র লুকিয়ে রাখার অভিযোগ। অস্ত্র পাচারের সম্ভাব্য রুট ও মজুতস্থল শনাক্তে ঘাটতি। একাধিক গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ ইতোমধ্যে গ্রাম ও শহরের অপরাধ চক্রের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উদ্ধার অভিযানে গতি না আসার পেছনে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।

নাগরিক সমাজ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অবিলম্বে নিখোঁজ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান জোরদার, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং অস্ত্র পাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, উদ্ধার না হওয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্র দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে থাকবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে সব অস্ত্র উদ্ধার নিশ্চিত করা না গেলে, তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে-এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বমহলে।

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মাঠ যখন উত্তপ্ত হওয়ার পথে, ঠিক তখনই এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা ভোটারদের জন্য বড় আতঙ্ক হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা-ভোটকেন্দ্র দখল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ওপর হামলা, ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ভোটাধিকার হরণ, নির্বাচনের ফল ঘিরে সংঘর্ষ, সবকিছুতেই এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হতে পারে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এসব অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে ভোটের দিন ও তার আগের সময়টিতে। একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কৌশলগত বিশ্লেষক বলেন,“ভোটকেন্দ্র দখল, প্রার্থীর ওপর হামলা বা ভোটারদের ভয় দেখাতে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্রই যথেষ্ট। এখানে ১৫৩টি অস্ত্র মানে শত শত সম্ভাব্য সহিংস ঘটনার বীজ।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাসির বলেন,“অস্ত্র আগে উদ্ধার না হলে পরে মোতায়েন করা বাহিনী শুধু প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায় থাকবে। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে অস্ত্রের উৎসেই আঘাত করতে হবে।”তিনি জানান,“নির্বাচনের সময় যদি অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে থাকে, তাহলে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পায়। এতে ভোটার উপস্থিতি কমে যায়, গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”তার মতে, এটি কেবল নিরাপত্তার নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।

করণীয় কী

বিশেষজ্ঞরা যেসব সুপারিশ করছেন-নিখোঁজ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি, নির্বাচনের আগে টাইম-বাউন্ড অভিযান, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান, অস্ত্র লুট ও আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। অন্যথায়, গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া এসব অস্ত্র দীর্ঘদিন ধরেই দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি নীরব বিস্ফোরণ হয়ে থাকবে-যার প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহভাবে দেখা দিতে পারে জাতীয় নির্বাচনের দিনগুলোতে।

গণ-অভ্যুত্থানে লুট হওয়া নিখোঁজ অস্ত্র কেবল অতীতের একটি অধ্যায় নয়-এটি ভবিষ্যতের বড় বিপদের ইঙ্গিত। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এসব অস্ত্র জাতীয় নির্বাচনের সময় রাষ্ট্র, জনগণ ও গণতন্ত্র-তিনটির জন্যই মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাছির।