গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের জন্য ক্ষমতাসীন তথা সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে সংসদের বিশেষ কমিটিতে প্রস্তাব করা হয়েছে, এমন দাবি করেছে সংসদের প্রধান বিরোধীদল জামায়াত।
বিরোধী দলীয় হুইপ ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, বিএনপির আপত্তির কারণে বুধবার অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি করা গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। আগামী রোববার অনুষ্ঠিত তৃতীয় বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে অধ্যাদেশ পর্যালোচনা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন দলটির নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানসহ নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুই দিনব্যাপী আলোচনায় আমরা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জনগণের কল্যাণকর প্রায় ১১৫টি বিষয়ে একমত হয়েছি। তবে ১৮ থেকে ২০টি বিষয়ে আমাদের গুরুতর দ্বিমত রয়েছে। বিশেষ করে গণভোট বিল রহিত করার যে প্রস্তাব সরকার এনেছে, আমরা তার তীব্র বিরোধিতা করেছি। গণভোট অস্বীকার করলে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাই আর থাকে না।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগে এতদিন একটি সিস্টেম বা সার্চ কমিটি ছিল। কিন্তু এখনকার প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে সেই সার্চ কমিটি বাদ দিয়ে সরকার যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নিতে চাচ্ছে। একইভাবে পুলিশ কমিশনার এবং আইজিপি নিয়োগেও পেশাদারিত্বের চেয়ে সরকারের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা বলেছি, এটি জুলাই চেতনার পরিপন্থি এবং আমরা এতে একমত হইনি।
সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, টু-থার্ড মেজরিটির দোহাই দিয়ে অতীতের সরকার অনেক কিছু করেছে। কিন্তু সেই অহংকার কোনো জাতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। জনগণের স্বার্থপরিপন্থি কোনো বিষয়ে আমরা একমত হব না। যে সংস্কার ও বিচারের ম্যান্ডেট নিয়ে এই সরকার এসেছিল, গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের মতো সেই অর্জনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা জনগণ মেনে নেবে না।
তিনি জানান, যেসব বিষয়ে একমত হওয়া যায়নি, সেগুলো নিয়ে আগামী ২৯ মার্চ আবারও আলোচনা হবে। এরপর ২ এপ্রিল চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, কোনো আইন বেআইনি কি না, তা আদালত নির্ধারণ করবে। কিন্তু সচল কোনো আইন বা অধ্যাদেশকে একতরফা বাতিল করার প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করিনি।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন এমপি'র সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এমপি, চীফ হুইপ মোঃ নূরুল ইসলাম এমপি, আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান এমপি, ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক এমপি, এ. এম. মাহবুব উদ্দিন এমপি, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মোঃ আব্দুল বারী এমপি, মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এমপি, মোঃ মুজিবুর রহমান এমপি, মোঃ রফিকুল ইসলাম খান এমপি এবং জি, এম, নজরুল ইসলাম এমপি।
জুলাই সনদ ও সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না
এদিকে বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে যাচাই-বাছাই কমিটি। ১২০টিরও বেশি অধ্যাদেশের বিষয়ে এরই মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী ২ এপ্রিল এই দীর্ঘ পর্যালোচনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তবে বিতর্কিত জুলাই সনদ বা সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
আইনমন্ত্রী জানান, দীর্ঘ পর্যালোচনার পর অধিকাংশ অধ্যাদেশ নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আমরা প্রায় ১২০টির বেশি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষ করেছি। কোনগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাখা হবে আর কোনগুলো বাতিল হবে, সে বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। তবে সুনির্দিষ্ট তালিকাটি এখনো চূড়ান্তভাবে ‘সর্ট-আউট’ করা হচ্ছে। ২ এপ্রিল রিপোর্টের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।
বাকি থাকা কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আগামী ২৯ মার্চ পুনরায় আলোচনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই বৈঠকের পরই পর্যালোচনার সব কাজ শেষ হবে এবং এগুলোকে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দলিল। এর ৩ নম্বর পেজের ৬-এর ক ধারা অনুযায়ী, সনদের ৮৪টি আর্টিকেলের মধ্যে ১ থেকে ৪৭ পর্যন্ত অংশ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। যারা একে বাইপাস করে ভিন্ন কোনো আদেশ দিতে চায়, তারা সনদের পরিপস্থি কাজ করছে। আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিয়েই সব পদক্ষেপ নিচ্ছি।
নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করা হবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দিকে তীক্ষè নজর রাখছি। ২ তারিখ রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর আইন পাসের প্রচলিত নিয়মেই বিলগুলো সংসদে উত্থাপিত হবে। তবে সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় বা নির্দিষ্ট কোনো স্পর্শকাতর অধ্যাদেশ এই তালিকায় আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি এখনই বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। মানবাধিকার কমিশন আইনের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ কমিটিতে ‘জুলাই সুরক্ষা’ নিয়ে সবাই একমত : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, বিশেষ করে ‘জুলাই সুরক্ষা’ সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে বিশেষ কমিটির সব সদস্য একমত হয়েছেন এবং এগুলো হুবহু সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, কিছু অধ্যাদেশ যেভাবে আছে সেভাবেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিল আকারে এনে পাস করবে। দ্বিতীয়ত, কিছু অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ বিল উত্থাপন করা হবে। আর তৃতীয়ত, যেসব বিষয়ে একমত হওয়া যাবে না, সেগুলো এই অধিবেশনে ‘ল্যাপস’ (বাতিল) হয়ে যাবে; প্রয়োজনে পরবর্তী অধিবেশনে নতুন বিল হিসেবে আসবে।
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী নতুন বিল পাসের আগে পুরনো অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে, যাতে আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।
অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং ‘সাংবিধানিকতা’– এই দুই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা জুলাই জাতীয় সনদকে এখানে প্রাধান্য দিচ্ছি। সাংবিধানিকতা রক্ষা এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিটি বিল বিবেচনা করা হচ্ছে।” অধিকাংশ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা শেষ হলেও দুদক আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাননীয় সভাপতি আগামী ২৯ মার্চ রাত ৮টা ৩০ মিনিটে পরবর্তী সেশনের সময় নির্ধারণ করেছেন। আশা করি, ওইদিন সন্ধ্যার মিটিংয়ে আমরা বাকি থাকা বিষয়গুলোর চূড়ান্ত ফয়সালা করতে পারব। সুনির্দিষ্ট কতগুলো অধ্যাদেশ চূড়ান্ত হয়েছে, তা ওইদিন বলা সম্ভব হবে।
জুলাই সুরক্ষা অধ্যাদেশ নিয়ে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, এটি গত বৈঠকেই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে এবং এতে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।