এক অনন্য সাধারণ ঈদ উদযাপন করলো দেশবাসী। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে ঈদ উল ফিতর। ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে, ভয়, শংকাহীন পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতে পেরে খুশি জনগণ। বিগত সময়ের ঈদ বিড়ম্বনার অনেক কিছুই ছিল না এবারের ঈদে। যাত্রাপথে ছিল না ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, ছিল না বাড়তি ভাড়া নেয়ার তোড়জোড়। স্বস্তি নিয়ে গাঁয়ে ফিরেছেন কর্মজীবী মানুষ। টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত তেমন ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি কাউকে। লাখ লাখ মানুষ রাজধানী ছাড়ায় ঢাকা এখন ফাঁকা নগরীতে পরিণত হয়েছে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে যাত্রীর চাপ বেশি থাকলেও খুব একটা ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। রাজধানীতে ফিরে এসেছিল ৪০০ বছরের সুলতানি-মুঘল আমলের ঐতিহ্য বর্ণাঢ্য ঈদ আনন্দ র্যালি। ঈদের দিন রাজপথে নেমে এসেছিল বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে ঈদ উল ফিতর। গত সোমবার রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক ও মোকাব্বিরের দায়িত্ব পালন করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন ক্বারী মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। ঈদ জামাতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের হাজারো মানুষ নামায আদায় করেন।
নামায শেষে খুতবা পাঠ করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। এর আগে আলোচনায় দেশ ও মুসলিম জাতির কল্যাণে দোয়া করা হয়।
ঈদের প্রধান জামাতের আয়োজন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ জানায়, ২৫ হাজার ৪শ’ বর্গমিটার আয়তনের মূল প্যান্ডেলে একসঙ্গে ৩৫ হাজার মুসল্লি ঈদের জামাত আদায় করেছেন।
ঈদের প্রধান জামাতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্য নামাযের আলাদা ব্যবস্থা ছিল।
নামায শেষে মুসল্লীদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে নতুন বাংলাদেশ গড়তে ঘনিষ্ঠতা ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিভিন্ন বাধা সত্ত্বেও আমরা আমাদের সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠব। আমরা এই নতুন বাংলাদেশকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৭টায়। প্রথম জামায়াতে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমানসহ নেতৃবৃন্দ। এরপর পর্যায়ক্রমে সকাল ৮ টা, সকাল ৯টা, সকাল ১০টা এবং সর্বশেষ সকাল ১০ টা ৪৫ মিনিটে ঈদের সর্বশেষ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
ঈদুল ফিতরের জামাতে অংশ নিতে ফজর নামাযের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা বায়তুল মোকাররমে আসতে থাকেন। সকাল ৭টার আগেই মসজিদ মুসল্লিতে পূর্ণ হয়ে যায়। সাতটায় শুরু হয় প্রথম জামাত। প্রতিটি জামাতেই মসজিদ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। প্রতিটি জামাতে দুই রাকাত ওয়াজির নামাযের পর খুতবা দেন ইমাম, এরপর হয় মোনাজাত।
মোনাজাতে গুনাহ মাফের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানানো হয়। মুসল্লিরা অনেকেই চোখের জলে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মোনাজাতের দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা বিকেলে তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে (সিএও) বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এদিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আয়োজনে সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে লক্ষাধিক মুসল্লী অংশগ্রহণ করেন। জামাতে ইমামতি করেন কারী গোলাম মোস্তফা। বিকল্প ইমাম হিসেবে ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মুফতি জুবাইর আহাম্মদ আল-আযহারী।
ঈদের জামাতের জন্য পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে প্রায় ৪৬ হাজার বর্গফুট আয়তনের প্যান্ডেল করা হয়। প্যান্ডেলের বাইরেও নামায আদায়ের জন্য কার্পেট ও বিছানা ছিল। প্যান্ডেলের ভেতরে দক্ষিণ পাশে নারীদের জন্য আলাদা নামাযের ব্যবস্থা ছিল। সেখানে নারীরা নামাযে অংশ নেন।
মাঠে প্রবেশের জন্য বিভিন্ন অংশে ছয়টি ফটক ছিল। ফটকে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য। প্যান্ডেলের দুই পাশে একসঙ্গে ১শ’ জন পুরুষ ও ৫০ জন নারীর অজু করার ব্যবস্থা ছিল। মাঠের বিভিন্ন জায়গায় খাওয়ার পানির ট্যাংক ছিল। ঈদ জামাতের জন্য মোট ১২ পেয়ার সাউন্ড সিস্টেম ও ১শ’টি মাইক ব্যবহার করা হয়।
জামাত শেষে বিশেষ মোনাজাতে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে নামাযে অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এ দিকে সুলতানি-মুঘল আমলের ঐতিহ্যকে ধারণ করে রাজধানী ঢাকার রাজপথে হয়েছে ঈদ আনন্দ মিছিল। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে আরও উৎসবমুখর করতে এই মিছিলের আয়োজন করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি), যেখানে ঢাকার ৪০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই মিছিল পেয়েছে আরও বর্ণিল রূপ।
সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাত শেষে সকাল ৯টায় সেখান থেকেই শুরু হয় বর্ণাঢ্য ঈদ আনন্দ মিছিল।
আগারগাঁওয়ের প্রধান সড়ক দিয়ে খামারবাড়ি মোড় হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়।
মিছিলে ছিল সুসজ্জিত পাঁচটি শাহী ঘোড়া, ১৫টি ঘোড়ার গাড়ি, ব্যান্ড পার্টি ও বাদ্যযন্ত্র। এ ছাড়া সুলতানি ও মোগল আমলের ইতিহাসচিত্র সম্বলিত পাপেট শো’র আয়োজন করা হয়। যা অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বাড়তি আনন্দ যোগ করে। মিছিল শেষে অংশগ্রহণকারীদের সেমাই ও মিষ্টি খাওয়ানো হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য ঢাকার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো ফিরিয়ে আনা। এই ঈদ আনন্দ মিছিল তারই একটি অংশ। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এর আয়োজন করা হবে।
এবারে ঢাকা উত্তর সিটির ঈদ আনন্দ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ দুই দিনব্যাপী ঈদ আনন্দমেলা। ঈদের দিন ও এর পরদিন এ মেলা হয়েছে বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ২০০টির বেশি স্টল বসে। মেলায় শিশুদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলা থাকবে। খেলাধুলার জন্য রাখা হয়েছে বিভিন্ন খেলার সামগ্রী।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়।
ছয় লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে শোলাকিয়ায় ঈদ জামাত : ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবছর শোলাকিয়ায় ঈদ জামাত পরিণত হয় জনসমুদ্রে। সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের সর্ববৃহৎ ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
সকাল ১০টায় শোলাকিয়ায় ১৯৮তম ঈদুল ফিতরের জামাতে ইমামতি করেন শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।
কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মিজবেহ রহমত বলেন, এবছর দেশ-বিদেশের প্রায় ছয় লাখ মুসল্লি এ ময়দানে একসঙ্গে নামায আদায় করেছেন। এবারের জামাতে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি মুসল্লি অংশ নেন।
আগের দিন রোববার থেকে শুরু করে সোমবার ভোর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকার লাখ লাখ মুসল্লির ঢল নামে শোলাকিয়া ময়দানে। সকাল সাড়ে ৮টার আগেই কানায় কানায় ভরে যায় ময়দান। সকাল ১০টায় নামায শুরু হলে শোলাকিয়া মাঠে উপচে পড়া ভিড়ের কারণে আশপাশের রাস্তা-ঘাট, বাসাবাড়ির ছাদ, নরসুন্দা নদীর পাড়ে মুসল্লিরা নামাযের কাতার করে দাঁড়িয়ে যান।
ঈদগাহ ময়দানের রেওয়াজ অনুযায়ী নামায শুরুর ১৫ মিনিট আগে পরপর তিনবার শটগানের গুলী ছুড়ে মুসল্লিদের নামাযে দাঁড়ানোর সংকেত দেওয়া হয়।
শোলাকিয়ায় নামায আদায়ের জন্য দুই দিন ধরে নরসিংদী, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, কুমিল্লা, বরিশাল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, যশোরসহ ৬৪টি জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে কিশোরগঞ্জে লোক আসতে শুরু করে। অনেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাসায়, আবাসিক হোটেল, শহরের মসজিদগুলোতে এবং ঈদগাহ মাঠে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়ে রাত যাপন করেন। ভোররাতে ট্রেন, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, রিকশা, মোটরসাইকেল, সাইকেল ও হেঁটে হাজারো মানুষ কিশোরগঞ্জে আসেন। সবার গন্তব্য ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান।
নামায শেষে বাংলাদেশসহ মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া করা হয়।
দিনাজপুরে গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত: দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে দেশের সর্ববৃহৎ ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সকাল ৯ টায় বিপুল সংখ্যক মুসল্লিদের অংশগ্রহণে দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ২৩ একর জমি নিয়ে বিস্তৃত গোর-এ-শহীদ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান। সারা দেশ থেকে মুসল্লিরা এ জামাতে অংশ নেন।
ঈদগাহ মাঠে আগত মুসল্লিদের শান্তিপূর্ণভাবে ঈদের জামাত আদায়ের জন্য এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও মুসল্লিদের ওযুর ব্যবস্থা, যানবাহন রাখার ব্যবস্থা, মেডিকেল টিম, খাবার পানিসহ ১৪৫টি মাইক রাখা হয়। মসজিদের প্রতিটি গম্বুজ ও মিনারে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা করা হয়।
সকাল থেকে মাঠে আসতে শুরু করে মুসল্লিরা। সকাল ৯টা বাজার আগেই মাঠ কানায় কানায় ভরে যায়। এই জামাতে ইমামতি করেন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান।