সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার’ শীর্ষক একটি নীতি সংলাপ এর আয়োজন করে। আলোচনাটি গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ (সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন। জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক বক্তব্যে অন্তর্ভুক্তি, সংখ্যালঘু অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন কতটা রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচক ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন সিপিডি’র ডিস্টিংগুইশড ফেলো ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান; -সুজন এর সেক্রেটারি বদিউল আলম মজুমদার; জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; ট্রান্স ফেমিনিস্ট, জেন্ডার ও সেক্সুয়াল রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট হো চি মিন ইসলাম; খেলাফত মজলিসের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল; জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট রাশনা ইমাম; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস. এম. শামীম রেজা; বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের (বিআইপিএফ) সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং; বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি সাঈদ ফেরদৌস; জাতীয় পার্টি (জেপি)-এর সাবেক সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী; ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলে বারী মাসুদ; ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম)-এর মহাসচিব মোমিনুল আমিন; অ্যাডভোকেট ও বিএনপি নেতা শিহাব উদ্দিন খান; গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী; শ্রমিক ও অধিকারকর্মী তাসলিমা আকতার; কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার উজ্জ্বল আজিম প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান বলেন, একটি গণতন্ত্রের গুণগত মান আংশিকভাবে নির্ধারিত হয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কতটা নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্ত বোধ করে তার ওপর। সংখ্যালঘু পরিচয় বাইরের কেউ চাপিয়ে দেবে নাকি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী নিজেরাই যেভাবে নিজেদের পরিচয় দিতে চায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায় নিজেকে সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত করতে না চাইলে সেই পরিচয় তাদের ওপর আরোপ করা যায় না। তিনি আরও বলেন, নারীরা এ ক্ষেত্রে একটি জটিল বাস্তবতার উদাহরণ। জনসংখ্যাগতভাবে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনী ক্ষমতার দিক থেকে তারা প্রায়ই সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হন। রাজনৈতিক ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তি ও সমঅধিকারের অঙ্গীকার থাকলেও সেগুলো স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ করা, বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ এবং পরিমাপযোগ্য বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
সুজন-এর সেক্রেটারি ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হলে তা নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্রকে সভ্য বলা যায় না। তিনি বলেন, ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভয়মুক্ত ভোট প্রদান এবং স্বচ্ছ ভোটপ্রক্রিয়াই অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তি। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত না হলেও এটি জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি চুক্তি। তাই ইশতেহার হতে হবে বিচারযোগ্য এবং জনগণের প্রতি দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নযোগ্য।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সময়োপযোগী ও বাস্তবধর্মী সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নের প্রত্যাশাও স্পষ্ট। সংখ্যাগত অবস্থান যাই হোক না কেন, সবাই এই দেশের নাগরিক এবং কাউকে সীমিত পরিচয়ে আবদ্ধ করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। তিনি বলেন, ইশতেহারে নারী নিরাপত্তা ও মর্যাদাসহ তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং অযৌক্তিক প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে চলা হয়েছে। এসব অঙ্গীকারের সঙ্গে বাস্তবায়নের একটি রোডম্যাপও যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট রাশনা ইমাম বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে আলোচনায় বাস্তবতা ও কার্যকারিতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ইশতেহারে কেবল আকাক্সক্ষাভিত্তিক ভাষা নয়, বাস্তবসম্মত নীতি এবং তার বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, জাতিসংঘের ১৯৯২ সালের সংখ্যালঘু অধিকার ঘোষণায় সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তবে তারা নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান হলেও ধনী গরিবের পার্থক্য এবং সংবিধানের সমতার প্রতিফলন না থাকায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিজেরা ভালো আছে এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে-এ কথা বলতে পারলেই বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে উন্নত বলা যাবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার-এই তিনটি বিষয় পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে গিয়ে নানা বাধা ও ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়। জুলাই আন্দোলনের পর সংস্কার ও বিচার নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আসন্ন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হবে কি না, তা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।