আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভবিষ্যতের সব নির্বাচনের জন্য একটি মানদণ্ড স্থাপন করবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশে সদ্য নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে এ মন্তব্য করেন অধ্যাপক ইউনূস। সাক্ষাৎকালে দুই পক্ষের মধ্যে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, শ্রম আইনের ব্যাপক সংস্কার, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক চুক্তি এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হবে। তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিপুলসংখ্যক নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠাবে এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরাও পর্যবেক্ষক পাঠাবে বলে তিনি আশাবাদী। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটি একটি উৎসবমুখর নির্বাচন হবে। ভবিষ্যতের ভালো নির্বাচনের জন্য এটি একটি মানদণ্ড তৈরি করবে। আসুন, আমরা আশাবাদী থাকি। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আসিয়ানের সদস্যপদ পেতে বাংলাদেশ উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে সার্ককে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। জবাবে রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যাঁরাই বিজয়ী হবেন, তাদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী। তিনি গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ এবং অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। নতুন শ্রম আইন প্রণয়নের উদ্যোগকেও তিনি সাধুবাদ জানান। প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে আরও শুল্ক হ্রাস সম্ভব হবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতিকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানায়। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ঢাকা-ওয়াশিংটন আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শিবিরগুলোতে বসবাসরত এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রতি বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ।

বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আসিয়ান সদস্যপদের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সংস্থাটির সঙ্গে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনারশিপের জন্য আবেদন করেছে। তিনি আরও বলেন, গত ১৮ মাসে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, যাতে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণ ও অর্থনীতি আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে। ভবিষ্যৎ সরকার এই উদ্যোগ এগিয়ে নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।

ধর্ম ও বর্ণভেদে নয়-বাংলাদেশ সকল মানুষের নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এদেশ আমাদের সকলের। ধর্ম ও বর্ণভেদে নয়-বাংলাদেশ সকল মানুষের জন্য এক নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি। ‘সরস্বতী পূজা’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা হিন্দু সম্প্রদায়ের সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হাজার বছর ধরে এদেশে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন।

তিনি বলেন, হিন্দু ধর্মমতে, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানের প্রতীক। তিনি বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। তিনি আমাদের অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যান। সরস্বতী পূজার এই পবিত্র উৎসব উপলক্ষে আমি প্রত্যাশা করি, আমাদের শিক্ষা যেন কেবল নিজের উন্নতির জন্য না হয়, বরং সমাজের উন্নতির জন্য হয়। আমরা যেন আমাদের জ্ঞান দিয়ে অন্যকে সাহায্য করি, দুর্বলদের পাশে দাঁড়াই এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি। প্রধান উপদেষ্টা হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ বাংলাদেশের সকল নাগরিকের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ : বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, আসন্ন নির্বাচন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান নতুন রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানান। ঢাকা ও ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে ক্রিস্টেনসেনের বিগত দিনগুলোর অবদানের কথা স্মরণ করেন উপদেষ্টা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন রাষ্ট্রদূতের মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আলোচনায় বাণিজ্য ও অভিবাসন ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বহুমুখী সম্পর্কের মূল বিষয়গুলো উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে; ১. পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি এবং বাংলাদেশে মার্কিন ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা। ২. সম্প্রতি আলোচিত ‘ভিসা বন্ড’ ইস্যুসহ অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে নথিপত্রহীন (আনডকুমেন্টেড) বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। ৩. রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা ও প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে সহযোগিতা। গণতান্ত্রিক উত্তরণে সমর্থন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চলমান প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি। বৈঠকে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কাউন্সিলর এরিক গিলানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।