ঈদের সব কেনাটাকা অন্য শপিং মলে সারলেও রাজধানীর নিউ মার্কেটের উল্টো দিকের গাউছিয়া ও চাঁদনী চকে এসেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের শিক্ষার্থী সামিয়া আফরোজ জেরিন। তিনি বলেন, সব সময়ই এখানে আসি, তবে ঈদের কেনাকাটা অন্যসব শপিং মল থেকেই করা হয়। কিন্তু কেন জানি এখান থেকে কিছু না নিলে অপূর্ণ থেকে যায়, তাই এখান থেকে একটা পাকিস্তানি ড্রেস নিলাম। ঈদে রাজধানীর বিভিন্ন শপিং মল ও বিপণিবিতানের মতো গাউছিয়া ও চাঁদনী চকও এখন সরগরম। প্রতিদিনই দেখা যায়, এ দুটি বিপণী বিতানে উপচেপড়া ভিড়।
ঢাকার প্রায় সব এলাকাতেই গড়ে উঠেছে শপিং মল। কিন্তু গাউছিয়া ও চাঁদনী চকের চাহিদা কমেনি এতটুকু। রোজার শুরু থেকেই ভিড় জমতে শুরু করে এখানে। সব শ্রেণির ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পোশাক মিলছে এ দুটি বিপণী বিতানে। নারীদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই-গজ কাপড়, তৈরি পোশাক, মানানসই জুতা-স্যান্ডেল, ব্যাগ, গহনা সবই পাওয়া যায় এখানে। মেয়েদের সালোয়ার-কামিজের সবচেয়ে বড় পাইকারি ও খুচরা বাজার হল এ দুটি বিপণী বিতান। দেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি কাপড়ের ওপর নতুন সব নকশার থ্রি পিস, গজ কাপড়, শাড়ি, জুতা, হাতব্যাগ, ছোটোদের পোশাক, প্রসাধনী, চুলের ব্যান্ড, অলংকার সবই রয়েছে গাউছিয়া ও চাঁদনী চকে।
গাউছিয়া মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় রয়েছে নানা ধরনের থ্রিপিস, ফোর পিস, সেলাই করা ও সেলাই ছাড়া পোশাক। দোতলাও একইভাবে সাজানো। তবে তিনতলায় রয়েছে পাকিস্তানি কাপড়ের সংগ্রহ এবং ব্যাগ ও জুতার দোকান। অন্যদিকে চাঁদনী চকের নিচতলা জুড়ে পোশাকের সঙ্গে রয়েছে মানানসই গহনার দোকান। ইমিটেশন, রুপার গহনা, কিছু স্বর্ণের গহনাসহ এখানে মিলছে নানা ধরনের গহনা। নিচতলার পূর্ব পাশে গজ কাপড়ের দোকান, যার বিস্তৃতি দোতলার কিছু এলাকাজুড়ে। তিনতলায় বাহারি নকশার মানানসই ব্যাগ। পশ্চিম দিকে রয়েছে দর্জি কর্নার।
দোকানগুলোতে বাহারি নকশার কাপড় ও তার ক্যাটালগ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। যার যেমন পছন্দ, সেরকম নকশার দেখে কোড নম্বর বললেই দোকানিরা তাৎক্ষণিকভাবে বের করে দেন পছন্দের পোশাকটি। এতে ব্যবসায়ীদেরও হাজারটা পোশাক বের করে দেখার ঝামেলা থাকছে না এবং ক্রেতাদের পোশাক বাছাই করতে সময় নষ্ট হয় না।
দাম বাড়ায় ক্রেতাদের অসন্তোষ : ভিড়ের পাশাপাশি পোশাকের দাম গত বছরের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষও দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হলেও বেশকিছু দিন ধরে খিলগাঁওয়ে বোনের বাসায় থাকছেন শাম্মি আক্তার, তিনি গাউছিয়ায় কেনাকাটা করতে এসেছেন বোনের কলেজপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে।
শাম্মি বলেন, আমরা এখানে নিয়মিত ক্রেতা। দাম তো তারা বাড়িয়ে দিয়েছে। যেসব জামা ৫/৬ হাজার টাকার মধ্যে ছিল, সেই জামা এখন ৭/৮ হাজার টাকা করে ফেলেছে। যেহেতু এখান থেকেই সবসময় ড্রেস কিনতে পছন্দ করি তাই নেব। কিন্তু দাম অনেক বেশি, তার পরেও পছন্দ করছি, নিতে তো হবেই। ব্যবসায়ীরা জানেন, এখানে এলে ক্রেতারা পণ্য নিয়েই যাবে, তাই দামের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয় না তারা।
ঢাকার মোহাম্মদ পূর থেকে আসা মধ্যবয়সি নারী সালমা আক্তার বলেন, মেয়েদের কাপড় কিনতে এসেছি, কিন্তু বেশির ভাগ দোকানেই দাম অনেক বেশি বলছে। দরদাম না করলে কেনা কঠিন হয়ে যায়। ভিড়ের কারণে তো জামাও দেখতে পারছি না।
আরেক ক্রেতা ধানমন্ডির বাসিন্দা পারভীন জামান বলেন, এই মার্কেটে পোশাকের দাম তুলনামূলকভাবে কম, এটাই দেখে আসছি। বিভিন্ন দেশের পোশাক, পোশাকের ডিজাইন ও মানও অনেক ভালো হয়। কিন্তু এবার অন্য সময়ের চেয়ে দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা যা বলছেন : সুতা থেকে শুরু করে পোশাক তৈরির প্রতিটি উপকরণের দাম বেড়েছে বলেই পোশাকের দামও বেশি নিতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। গাউছিয়া মার্কেটের স্মার্ট ফ্যাশনের কর্ণধার মোসলেম উদ্দিন বলেন, কোনটার দাম বাড়েনি, সবকিছুর দাম বেশি। সুতা থেকে শুরু করে কাপড় তৈরির প্রতিটি উপকরণের দাম বেড়েছে। তাহলে আমাদের তো আর গার্মেন্ট থেকে কম দামে দিবে না। বড় ব্যবসায়ীরা যে দামে আমাদের দেয় আমরা সেই হিসাবেই বিক্রি করি। আরেক ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, দাম বাড়ার বহু কারণ আছে, তবে যেমন বলছেন তেমন বাড়েনি। কিছুটা বেড়েছে। প্রতিটি পোশাকে গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে দাবি করে এ ব্যবসায়ী বলেন, দাম বাড়ার আরেকটা কারণ হল ভারতীয় কাপড় এবার মার্কেটে নাই বললেই চলে। যার কারণে পাকিস্তানি কাপড় বেশি। আর পাকিস্তানি কাপড়ের দাম একটু বেশিই।”
পাকিস্তানি পোশাকের রাজত্ব : রাজধানীর শপিংমল ও বিপণিবিতানগুলোর চেয়ে বিদেশি পোশাক বেশি বিক্রি হয় গাউছিয়া ও চাঁদনী চক মার্কেটে। ভারত থেকে বেশি পোশাক আমদানি না হওয়ায় এবার ঈদের বাজার পাকিস্তানি পোশাকই বেশি। পাকিস্তানি পোশাকের মধ্যে জর্জেট ও সিল্কের থ্রি-পিস, গাউন, ওয়ান পিস, সিল্কের ওপর বিভিন্ন রঙের ডিজিটাল প্রিন্টের চাহিদা বেশি। বিক্রেতারা বলছে, এবার ভারত থেকে পোশাক কম আমদানি হওয়ায় বাজারে একক আধিপত্য বিস্তার করেছে পাকিস্তানি পোশাক।
চাঁদনী চকের ব্যবসায়ী শরিফ মিয়া বলেন, ভারত থেকে এবার আশানুরূপ পোশাক আমদানি হয়নি। অনেক ব্যবসায়ী প্রতিবছর যে পরিমাণ পোশাক ভারত থেকে আনেন, এবার সেভাবে আনতে পারেননি। অনেকে আগাম বুকিং দিলেও নির্ধারিত সময়ে পণ্য বুঝে পাননি। এসব কারণে এবার দাম কিছুটা বেশি। আর অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মার্কেটে পাকিস্তানি পোশাক বেশি। আমরাও বেশি বিক্রি করছি পাকিস্তানি পোশাক।
ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, ভারতীয় কাপড় এবার মার্কেটে নাই বললেই চলে। যার কারণে পাকিস্তানি কাপড় বেশি। আর পাকিস্তানি কাপড়ের দাম একটু বেশিই।