ফুয়েল পাস চালুর চিন্তা সরকারের

পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

পেট্রোল ও অকটেন বিক্রির ক্ষেত্রে ফুয়েল পাস চালুর চিন্তা করছে সরকার। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী এ কথা জানান। প্রাথমিকভাবে পেট্রোল এবং অকটেনের ক্ষেত্রে এ পাস চালু হবে। এজন্য একটি অ্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু কিছু জেলায় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফুয়েল পাস চালু হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন যুগ্ম-সচিব।

তিনি বলেন, আমাদের একটা তো হচ্ছে বৈশ্বিক সংকট, কিন্তু আমাদের যে লোকাল রিসোর্স আছে এটা আমরা সর্বোচ্চ কীভাবে... আমদানিও করলাম কিন্তু লোকাল কিছু তো প্রবলেম আছে আমাদের, সেগুলো কীভাবে আমরা অ্যাড্রেস করবো? মানুষকে কীভাবে আমরা তার মনস্তাত্ত্বিক জগতে পরিবর্তন আনবো? এটা তো আসলে ওভারনাইট করা যাবে না।

যুগ্ম-সচিব বলেন, আমরা একটা ফুয়েল পাস করার চিন্তা-ভাবনা করছি। অনেক জেলায় ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসকরা এরই মধ্যে তাদের নিজস্ব অধিক্ষেত্রে কিছু কিছু করেছেন। যেমন আজকে সকালের মিটিংয়ে আমি দেখেছি ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক বিশেষ করে মোটরসাইকেলের জন্য একটা পাস ইস্যু করছেন তিনি।

পাসটা এ রকম, আমি আপনাদের একটা ধারণা দেওয়ার জন্য বলছি, আমি তাকে প্রশ্ন করলাম যে তুমি এটা এক্সিকিউট কীভাবে করছো? তারা ইস্যু করবে পাস, প্রথমেই বাদ পড়ে যাবে যাদের রেজিস্ট্রেশন নেই তারা। তারা আর এই পাসটা পাবে না। আচ্ছা তাহলে কিন্তু আমার এটা কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। এরপরে যারা থাকলো তাদের আমরা ফিলিং স্টেশনগুলোতে অ্যালাউ করছি। ফিলিং স্টেশনে যাবে এবং সেখানে একটা তাদের যে পাসটা দেওয়া হবে সেখানে বোধহয় একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ লিখে দেওয়া হবে এবং সেটা ডিডাক্ট করা হবে। মনির হোসেন বলেন, আমাদের প্রতিটা ফিলিং স্টেশনে এখন আমরা প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছি। অর্থাৎ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসক তো মাত্র ৬৪ জন কিংবা ইউএনওদেরও অনেক কাজ আছে। আমরা অন্যান্য যেসব অফিসার আছে তাদের প্রত্যেককে সম্পৃক্ত করে কীভাবে এই ম্যানেজমেন্টটা আমরা করতে পারি। তিনি বলেন, বিপিসি তো আসলে যেটা করে যে তেল এনে তেলটা বিক্রি করে। কিন্তু ফিলিং স্টেশনের একটা ম্যানেজমেন্ট আছে বা অন্যান্য যেসব ম্যানেজমেন্ট আছে এগুলোতে আসলে বিপিসির ওইভাবে দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি না এগুলো ম্যানেজ করতে হবে। না হলে আমরা জনগণকে ওই অর্থে শান্তিটা দিতে পারছি না। সেজন্য সরকারি এসব কর্মকর্তাদের ফিলিং স্টেশন প্রত্যেকটা ফিলিং স্টেশনে না হলেও এক দুইটা ফিলিং স্টেশন একজন ট্যাগ অফিসার আমরা নিয়োগ করার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছি।

ডিসি অফিসে গিয়ে ফুয়েল পাস নেওয়া তো একটা কঠিন কাজ হবে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেই তিনি বলেন, এটা আসলে অত সহজ নয়। তবে আমাদের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসকরা মোটামুটি সফলভাবে একটি সুনির্দিষ্ট যানবাহনকে লক্ষ্য করে তারা কাজ করছে। সেটা হচ্ছে মোটরসাইকেল।

তিনি বলেন, ৬৩ শতাংশ ডিজেল সরবরাহ করি, ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ অকটেন দেই লাইন কিন্তু অকটেনের। ডিজেলের ক্ষেত্রে কোথাও সমস্যা নেই। এজন্যই এই সমস্যাটা (অকটেন সংকট) কৃত্রিম। বড় পরিসরে কবে ফুয়েল পাস দেওয়া হবে সে বিষয়ে জানানো হবে। তবে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এ রকম কিছু করা যেতে পারে। আমরা একটা অ্যাপ তৈরি করছি। তিনি আরও বলেন, এটা করতে একটু সময় লাগবে, কারণ একটা কিউআর কোড দিতে হবে। এক সপ্তাহের তার একটা সীমা দিতে হবে। যেন এ সময়ের মধ্যে একবার তেল নিলে আবার তেল নিতে গেলে যেন টের পাওয়া যায়। এ ব্যবস্থাটা হয়তো কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কোন কোন গাড়ির ক্ষেত্রে ফুয়েল পাস দেওয়া হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুগ্ম-সচিব বলেন, ‘বিষয়টি এখনো বিবেচনার পর্যায়ে আছে। সবগুলো একসঙ্গে করাটা খুব কঠিন হয়ে যাবে। হয়তো পেট্রোল, অকটেনচালিত যেগুলো সেগুলোকে টার্গেট করে ফুয়েল পাস চালু হতে পারে।

পাম্পগুলোতে অপেক্ষা ঘণ্টার পর ঘণ্টা: এদিকে রাজধানীর পাম্পগুলো বেশ কয়েকদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছে না। এমন অবস্থায় ডিপো থেকে যতটুকু জ্বালানি আসছে তা নিতে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য গাড়ির চালকরা আগেভাগেই ভিড় করছেন পাম্পে। ছুটি বা কর্মদিবস- কোনো দিনই সেখানে ফাঁকা থাকছে না। গতকাল সোমবারও রাজধানীর তেল পাম্পগুলোর সামনে চালকদের বিশাল সারিতে অপেক্ষা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন ও সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন, পরিবাগের পূর্বাচল ফিলিং স্টেশন ও মেঘনা ফিলিং স্টেশন এবং তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে এমন চিত্র দেখা গেছে। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে মহাখালীমুখী এবং মেঘনা ফিলিং স্টেশন এলাকায় শাহবাগ মোড়মুখী সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। পূর্বাচল ফিলিং স্টেশনে আড়াইটার দিকে দেখা যায়, তেল বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ। এসময় ডিপো থেকে আসা তেল খালাসের কার্যক্রম চলছিল। ডিপোর গাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গে পাম্পের সামনে শতাধিক মোটরসাইকেল জড়ো হয়ে যায়। পূর্বাচল ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী সোহেল বলেন, আমাদের তেল ছিল না। কেবল গাড়ি আসছে, তেল নামাচ্ছে। নামানো হলেই দেব। জনপ্রতি কত টাকার তেল দেবেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব মোটরসাইকেল ৫০০ টাকার করে তেল পাবে।

এছাড়া, আসাদগেট এলাকার তালুকদার পাম্প থেকে তেল নিতে গণভবন হয়ে জিয়া উদ্যানমুখী সড়কে এবং সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে টাউনহলমুখী সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। দুপুরে তালুকদার পাম্পের সামনে অপেক্ষারত মোটরবাইকচালক জহুরুল ইসলাম বলেন, কাল থেকে তেল দেয়নি। একটু আগে শুরু করছে। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি আড়াই-তিন ঘণ্টা। পাম্পে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী জানান, সকাল থেকে তেল ছিল না তাই দেওয়া বন্ধ ছিল। এখন তেল দেওয়া শুরু হয়েছে। অণ্যদিকে, পাম্পের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা শেষে চাহিদার তুলনায় কম তেল পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন যানবাহনের চালকরা। সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষারত মোটরসাইকেলচালক শিমুল বলেন, অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এত সময় দাঁড়িয়ে থেকে মাত্র ৫০০ টাকার তেল পাওয়া যাচ্ছে। যে সময় দিচ্ছি সে অনুযায়ী ট্যাংকি ফুল করে দিলে কষ্টটা মানা যেত। যে তেল দিয়েছে তাতে সর্বোচ্চ তিনদিন পর আবার পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে দু-তিন ঘণ্টা শ্রম দিতে হবে।