ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এমন দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রুথ সোশালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ভেনেজুয়েলা ও তার নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে এবং স্ত্রীসহ তাকে আটক করা হয়েছে। পরে তাদের দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ ‘এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়েছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে। আজ সকাল ১১টায় মার-এ-লাগোতে সংবাদ সম্মেলন হবে। এই বিষয়ে আপনার মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ! প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।’ এদিকে ভেনেজুয়েলাজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ভেনেজুয়েলায় হামলা শুরু করে মার্কিন বাহিনী। কারাকাসের বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। বিবিসি, এএফপি।

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদুরোর বিচার করা হবে

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর মাইক লি জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে জানিয়েছেন, যেহেতু মাদুরোকে আটক করা হয়েছে তাই ভেনেজুয়েলায় আর কোনো হামলা চালানো হবে না। অপরদিকে আটককৃত মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এখানেই হবে তার বিচার। মাইক লি মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে লিখেছেন, “পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ধারণা দিয়েছেন, মাদুরো যেহেতু এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, তাই ভেনেজুয়েলায় আর হামলা চালানো হবে না।”

মাদুরোকে আটকের ওয়ারেন্ট যারা বাস্তবায়ন করতে গিয়েছিলেন তাদের রক্ষায় ভেনেজুয়েলায় মধ্যরাতে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে রুবিও জানিয়েছেন বলে জানিয়েছেন এ সিনেটর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ মাদুরো ভেনেজুয়েলায় একটি মাদক সাম্রাজ্য চালান। সেখানে মাদক উৎপাদন করে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। এ কারণে মাদুরোর বিরুদ্ধে ২০২০ সালেই পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তার বা আটসে সহায়তা করলে ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম কয়েকজন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, মাদুরোকে আটক করেছে ডেল্টা ফোর্স। এটি দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট।

ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলায় বিমান হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টানা কয়েক মাসের হুমকির পর ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে সিরিজ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। গতকাল শনিবার ভোরে এই হামলার খবর নিশ্চিত করেছেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা। প্রত্যক্ষদর্শী এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, স্থানীয় সময় রাত ২টা থেকে টানা দেড় ঘণ্টা ধরে কারাকাসের আকাশে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ, যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং ঘন কালো ধোঁয়া আচ্ছন্ন হয়ে ছিল।

হামলার পরপরই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে মোতায়েন করেছেন। ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজধানী কারাকাস ছাড়াও মিরান্ডা, আরাগওয়া এবং লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যেও এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। কারাকাসের একটি প্রধান সামরিক ঘাঁটির কাছে বিস্ফোরণের পর শহরের দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এদিকে পেন্টাগন এই অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য না দিয়ে হোয়াইট হাউসের দিকে ইঙ্গিত করলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে গত সোমবারই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোকে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াকে ‘বুদ্ধিমানের কাজ’ হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে তিনি দক্ষিণ আমেরিকার এই তেল উৎপাদনকারী দেশটিতে স্থল অভিযানের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এদিকে নিকোলাস মাদুরোর সরকার এই আক্রমণকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ দখলের একটি অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটন কোনোভাবেই দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করতে পারবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলো দাবি করে আসছে যে, গত বছর কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে মাদুরো ক্ষমতায় টিকে আছেন।

এই হামলার আগে থেকেই ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধজাহাজ এবং অত্যাধুনিক ফাইটার জেটের উপস্থিতি বাড়িয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। মাদুরো সরকারের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মাদুরো যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান সেজন্যও গোপনে চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগ তুলে গত সপ্তাহেই মাদকবাহী নৌযানগুলোতে প্রথমবার স্থল অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যদিও অনেক দেশ এই ধরণের আক্রমণকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। মাদুরো সরকার মাদক পাচারের অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছিল। সাম্প্রতিক এই হামলার পর ভেনেজুয়েলাজুড়ে চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

মাদুরোর ‘জীবিত থাকার প্রমাণ’ চাইলেন ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট

প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়েছে-যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবির পর, তার ‘জীবিত থাকার প্রমাণ’ চাইলেন ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। প্রেসিডেন্ট মাদুরো বা ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস কোথায় আছেন এ বিষয়ে ভেনেজুয়েলা সরকার এখনও জানে না বলেও নিশ্চিত করেন তিনি। ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, সরকার তাদের উভয়েরই ‘তাৎক্ষণিক জীবিত থাকার প্রমাণ’ দাবি করেছে।

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নতুন ঘোষণা

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো দেশজুড়ে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন। স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া একটি ভিডিও ভাষণে, শনিবারের এই মার্কিন হামলাকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে বাজে আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী । এসময় দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। ভেনেজুয়েলা মাদুরোর নির্দেশ অনুসরণ করছে উল্লেখ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘তারা আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে কিন্তু তারা আমাদের দমন করতে পারবে না।’ এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর ভেনেজুয়েলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। রাত ২টায় দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ অন্যান্য অঞ্চল বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। এরপর ভেনেজুয়েলার সরকার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন জায়গায় সামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে।