আইনশৃংখলা রক্ষায় পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব একুশ বছরে পা দিচ্ছে। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্যারেডে অংশ নিয়ে এই বাহিনী আত্মপ্রকাশ করলেও পবিত্র রমযান মাসসহ নানা কারণে এ বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের কোন কর্মসূচি নেই। সারা দেশে র‌্যাবের ব্যাটালিয়ন সংখ্যা ১৫। ব্যাটালিয়ন পর্যায়েও কোন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি।

দেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস দমন ও আইনশৃঙ্খলা-নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত বিভিন্ন বাহিনীর চৌকস সদস্যদের নিয়ে গঠিত র‌্যাব‘র ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২৬ মার্চ রোববার। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে গঠিত র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছর দিনটিকে ‘রেইজিং ডে’ হিসেবে পালন করে আসছে। বিগত কয়েক বছরে রমযানের কারণে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান কখনও এগিয়ে আনা হলেও এবার কোন কর্মসূচিই থাকছে না বলে গতকাল রোববার দৈনিক সংগ্রামকে জানিয়েছেন ফোর্সটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে: কর্নেল মুনীম ফেরদৌস। রমযান শেষেও কোন কর্মসূচির পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবছর সাহসিকতা ও সেবা দুই ক্যাটাগরিতে র‌্যাব কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার দেওয়া হয়ে আসছে, এবার সেটা হচ্ছে না।এছাড়া, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দ্বিতীয় দিনে র‌্যাব মেমোরিয়াল ডে’তে এ পুরস্কার দেওয়া হতো। এদিন র‌্যাবে কর্মরত শহীদদের স্মরণে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার রেওয়াজ। যাতে নিহতদের পরিবারের সদস্য অংশ নেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই বাহিনী ২০০৪ সালে স্বাধীনতা দিবসের প্যারেডে অংশ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। প্রায় তিন সপ্তাহ পর ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) রমনা বটমূলে নিরাপত্তা দিয়ে র‌্যাব তাদের কার্যক্রম শুরু করে। একই বছরের ২১ জুন পূর্ণাঙ্গভাবে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু বাহিনীটি।

প্রতিষ্ঠার পর সাংগঠনিক কর্মকা- ছাড়াও স্ব স্ব এলাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ শুরু করে র‌্যাব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে র‌্যাবের জনবল ও ব্যাটালিয়নের সংখ্যা। বর্তমানে সারা দেশে এই এলিট ফোর্সটির ব্যাটেলিয়ন সংখ্যা ১৫টি। যেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার ও সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের বাছাই করা চৌকস কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন।

র‌্যাব দেশে জঙ্গীবাদ নির্মূলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে জঙ্গী সংগঠন জেএমবি তাদের শক্তি জানান দেওয়ার পরপরই মাঠে নামেন র‌্যাব গোয়েন্দারা। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, সামরিক শাখার প্রধান আতাউর রহমান সানিসহ শত শত জঙ্গীকে।

এছাড়া গুলশানের হলিআর্টিসানে জঙ্গী হামলার পর র‌্যাব অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়। তাছাড়া প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে বাহিনীটি। বিশেষ দিনগুলোতেও তাদের নিরাপত্তা দিতে দেখা যায়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক জঙ্গী ও জলদস্যু র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তারা এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। র‌্যাব নিজস্ব অর্থায়নে তাদের পুনর্বাসনে ভূমিকা রেখেছে। র‌্যাবের এই ভূমিকাকে মানবিক বিচারেও এগিয়ে রাখছেন মানবাধিকার বিষয়ে সচেষ্ট ব্যক্তিরা।

২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ক্যাসিনো অভিযানে বড়বড় রাঘব বোয়ালদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনে বাহিনীটি। যাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় নগদ কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, মাদক, অস্ত্র ও ক্যাসিনোর সরঞ্জাম।

‘রিপোর্ট টু র‌্যাব’মোবাইল অ্যাপস সন্ত্রাস, মাদকসহ বিভিন্ন কর্মকা- সম্পর্কে জানাতে মোবাইল অ্যাপ চালু আছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসী তথ্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরাধ, নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য, খুন, অপহরণ, মাদক, ডাকাতির বিষয়ে যে কেউ সহজে জানাতে পারে।

বিগত বছরের কার্যক্রম : বিগত এক বছরে র‌্যাব সারাদেশে অভিযান চালিয়ে ২১ হাজার ২৯১জনকে গ্রেফতার করে, যারা বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ও মামলায় অভিযুক্ত। তাদের মধ্যে মাদক বিরোধী মোবাইল কোর্ট চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় ৫৩জন। জলদস্যু ও বনদস্যু গ্রেফতার করা হয় ৫০জন। এ সময় ১৮টি অস্ত্র ও ২৮ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ১১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় মানব পাচারের শিকার ১৮জন পুরুষ ও ২০জন মহিলাকে উদ্ধার করা হয়। অপহরনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫৮৬জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় ১০৯জন পুরুষ, ৪২৭জন মহিলা, ৮৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে একজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। ডাকাতীর অভিযোগে ৬৭৬জন, চাঞ্চল্যকর হত্যা-ধর্ষণের অভিযোগে ১৮৫২জন, ৭২৭ ছিনতাইকারী, ৯২৭ চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করা হয়। অবৈধ ভিওআইপি বিরোধী অভিযান চালিয়ে ৩১জনকে গ্রেফতার করা হয়। বিভিন্ন প্রতারনার দায়ে ২৬৭ প্রতারক, ৩৬জন দেশী বিদেশী জালনোট প্রস্তুতকারী ও ব্যবসায়ী গ্রেফতার করা হয়। এ সময় দেড়কোটিরও অধিক মূল্যের দেশীয় জাল টাকা, প্রায় ১৫ লাখ মূল্যের বিদেশী জাল টাকা উদ্ধার করা হয়। ৫৭টি বিভিন্ন ধরনের চোরাই গাড়ী উদ্ধার করা হয়। এ সময় জড়িত থাকার অভিযোগে ৬১জনকে গ্রেফতার করা হয়। ৬৩৮টি অস্ত্র, ১০ হাজার ৫৮৮ রাউন্ড গোলাবারুদ, ৩৮৮টি বিস্ফোরক, ৮০৮ কেজি বিস্ফোরক দ্রব্যও উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেফতার করা হয় ৩২৬জনকে। বছরজুড়ে কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযানে ৭৯৮ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। বিভিন্ন মাদক মামলায় ৪ হাজার ৭৫৫জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় বিভিন্ন মাদকদ্রব্যও উদ্ধার করা হয়। তার মধ্যে ৯৬ কেজি হেরোইন, ১ লাখ৬০ হাজার বোতল ফেন্সিডিল, ৪৬ লাখ ইয়াবা উদ্ধার উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, প্রশ্ন পত্র ফাঁস, নারী ও শিশু পাচারসহ নানা ছোটবড় অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৪জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।