• রেলপথে বাড়ি ফেরা মানুষের ঈদযাত্রা শুরু
  • ৩৬ হাজার ট্রেন টিকিটের জন্য ৩৭ লাখ আবেদন
  • দূরপাল্লার বাসে বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাড়ি ফেরা মানুষের ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এরইমধ্যে বাড়ি ফিরছেন তারা। বিশেষ করে ঈদের আগে দুর্ভোগ এড়াতে মূলত আগে ভাগেই যাত্রা শুরু করেছে অনেক মানুষ।

এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল শুক্রবার ভোর থেকে রেলপথে শুরু হয়েছে বাড়ি ফেরা মানুষের ঈদযাত্রা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ভোর ৬টায় রাজশাহীর উদ্দেশে আন্তঃনগর ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এ যাত্রা শুরু হয়।

এছাড়া ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজার অভিমুখী পর্যটক এক্সপ্রেস ও ভোর সাড়ে ৬টায় সিলেট অভিমুখী পারাবত এক্সপ্রেস কমলাপুর রেলস্টেশন ছেড়ে যায়। পর্যায়ক্রমে সূচি অনুযায়ী অন্যান্য ট্রেনও ছেড়ে যাবে বলে জানিয়েছে স্টেশন কর্তৃপক্ষ।

কমলাপুর রেলস্টেশন খোজ নিয়ে জানা গেছে, নেই কোনো শিডিউল বিপর্যয়। নেই যাত্রীচাপও। তবে সিলেট অভিমুখী পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে কিছুসংখ্যক যাত্রীকে যাত্রা করতে দেখা গেছে।

এই রেলস্টেশনে দেখা যায়, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। টিকিটবিহীন যাত্রী এড়াতে প্ল্যাটফর্মের বাইরে বাঁশের বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। মোতায়েন ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও।

এদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের বাকি আর অল্প কয়েকদিন। ঈদের ছুটি শুরু হলে বাড়তি চাপ হবে এমন ভয়েই আগেই সড়ক পথে ঢাকা এবং ঢাকার আশ্বে পাশ্বের জেলা ছাড়ছেন মানুষ। মূলত ভোগান্তি এড়াতে এমন তড়িঘড়ি বলে জানালেন কয়েকজন যাত্রী।

শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, মৌচাক, শিমরাইল মোড় ও কাঁচপুর এলাকার বাস কাউন্টারগুলো ঘুরে এ তথ্য জানা যায়। এসময় আগের তুলনায় কাউন্টারগুলোতে যাত্রী ও যানবাহনের বাড়তি চাপ দেখা গেছে।

সরেজমিন দেখা যায়, মহাসড়কের বাস কাউন্টারে যাত্রীরা ভিড় করছেন। বিশেষ করে পুরুষের তুলনায় নারী, বৃদ্ধ ও শিশু যাত্রী বেশি দেখা গেছে। মূলত যানজট আর ভোগান্তি এড়াতে পুরুষ সদস্যরা নারী ও শিশুদের আগেই বাড়ি পাঠাচ্ছেন।

এদিকে পুলিশ বলছে, ঈদকে কেন্দ্র করে এবার যাত্রীদের কোনো ভোগান্তি হবে না। যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন সরিয়ে নেওয়ার জন্য সব প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।

সাইনবোর্ড বাস কাউন্টারের সামনে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন শিপন আহমেদ নামের এক যাত্রী। তিনি দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, প্রতিবার ঈদের ছুটি শুরু হলে যাত্রী চাপ অনেক বেশি হয়। তখন গাড়ি পেতে ঝামেলা এবং যানজটের ভোগান্তি তো থাকেই। তাই ছুটি কার্যকরের আগেই ভোগান্তি এড়াতে পরিবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। ছুটি শুরু হলে ধীরেসুস্থে যাব।

মেহেদী হাসান সোহাগ নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ছুটি শুরু হবে আরও তিনদিন পর। তখন দেখা যাবে সকলের ছুটি শুরু হয়ে যাবে, সড়কেও ভিড় বাড়বে। সেজন্য আজ স্ত্রী-সন্তানদের পাঠিয়ে দিচ্ছি। ছুটি শুরু হলে কোনো এক ফাঁকে যাব।

তাইমুর নামে এক যাত্রী বলেন, সব সময় বাড়িতে যাই ঈদের দিন সকালে। কারণ, চাঁদরাতে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে হয়। তাই যানজট এড়াতে পরিবারকে আগেই পাঠিয়ে দিই। এবার বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে অনেক দিন হয়েছে। তাই এখন পরিবারের সব সদস্যকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

শিমরাইল হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ জুলহাস উদ্দিন বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এরই মধ্যে তৎপরতা শুরু করেছি। পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ অংশে মানুষকে যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।

বেশি দামে বাসের টিকিট বিক্রির অভিযোগ :

ঢাকা থেকে নাটোরে যাবেন আরমান হক সঙ্গে তার স্ত্রী ও ছোট বাচ্চা। দুজনের জন্য টিকিট কাটেন অনলাইনে। অন্য সময় গাবতলী থেকে নাটোরের ভাড়া ৫৮০ টাকা। কিন্তু তাকে অনলাইনে কাটতে হয়েছে ৭৫০ টাকায়। ২৭০ টাকা বেশি দামে টিকিট কিনে তিনি ক্ষুব্ধ।

তার মতে, তিনি নাটোরের কাচিকাটা গন্তব্যের টিকিট কাটতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কাউন্টারম্যান তাকে জোর করে কুষ্টিয়া পর্যন্ত টিকিট কাটিয়েছে। ফলে ২৭০ টাকা বেশি ভাড়া আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার।

এই যাত্রী বলেন, আমি কাচিকাটা গন্তব্যের টিকিট চেয়েছি। কিন্তু তারা বলে এই টিকিট হবে না। তারা আমাকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত টিকিট কাটতে এক প্রকার বাধ্য করেছে। এটা তো জুলুম। শুক্রবার সকালে গাবতলীর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের পূর্ব দিকে থাকা হানিফ পরিবহনের একটি কাউন্টারে গিয়ে এই অভিযোগ পাওয়া যায়।

রিয়াজ আহমেদ একটি বাহিনীতে কর্মরত। আগাম ছুটি পাওয়ায় আজ বাড়ি যাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি নাটোর যাব, কিন্তু আমাকে রাজশাহীর টিকিট কাটতে হলো। তারা বলছে, ঈদে নাকি নাটোর রুট তাদের বন্ধ। তারা সরাসরি রাজশাহী চালাচ্ছেন।

এমন অভিযোগ উঠেছে এফ কে সুপার ডিলাক্স নামের একটি বাস কাউন্টারের বিরুদ্ধেও। এ বিষয়ে কথা বলতে কাউন্টারম্যানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। দুই কাউন্টারে থাকা কর্মীরা কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

শুধু ঢাকা থেকে নাটোর নয়, রাজশাহী, রংপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম রুটে ঈদের টিকিটে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।

ঢাকা থেকে রংপুর যাবেন পঞ্চগড়ের যাত্রী রুবেল ও সোমা। এই দম্পতি দুপুর ১২টায় এসে সরাসরি দুপুরে যাবেন এমন বাসের টিকিট খুঁজছিলেন। রুবেল জানালেন, তিনি এসেই হানিফ ও শ্যামলীর বাস কাউন্টারে টিকিট খুঁজেছেন। কিন্তু তার দামে মিলেনি বলে নেননি। তবু কিছুটা কমে পাওয়া যায় কি না সেই খোঁজ করছেন।

তার দাবি, হানিফ বাসের জন্য ঢাকা থেকে রংপুর চাওয়া হয়েছে ৮৭০ টাকা। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ভাড়া ৮২০ টাকা। তার যুক্তি, ৭০ টাকা আমি কেন বেশি ভাড়া দেব! কিন্তু যারা টিকিট বিক্রি করছেন তারাও নাছোড়বান্দা। ওই দামে ছাড়া টিকিট বিক্রি করবেন না।

৩৬ হাজার টিকিটের জন্য ৩৭ লাখ আবেদন :

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত ৩ থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন, তবে রেলের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রায় ৩৬ হাজার টিকিট বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। শুক্রবার ঈদযাত্রার প্রথম দিনে ঢাকার প্রধান রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।

রেলমন্ত্রী বলেন, ৩ মার্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে ঈদের ১০ দিন আগের টিকিট অনলাইনে ছাড়া হয়েছিল। যাত্রীরা সেই টিকিট সংগ্রহ করেছেন এবং আজ থেকেই ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

তিনি বলেন, অনলাইনে টিকিট বিক্রির সময় ব্যাপক চাপ ছিল। প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ টিকিট কেনার চেষ্টা করলেও রেলের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রায় ৩৬ হাজার টিকিট বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। তবে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে রেল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে।

১৭, ১৮ ও ১৯ মার্চের বাস টিকিট আগেই শেষ :

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে আগাম টিকিট বিক্রি নির্ধারিত দিনের কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়েছে। বাস কাউন্টার সংশ্লিষ্টদের দাবি, তারা গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে আগাম বাসের টিকেট বিক্রি শুরু করেছেন। তিন ফেব্রুয়ারি কয়েকদিনের মধ্যে সকল টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে। ফলে আগাম টিকিট বিক্রির জন্য তাদেরকে এখন আর কোনো কষ্ট করতে হচ্ছে না। আগামী ১৭, ১৮ ও ১৯ মার্চ তারিখের কোনো টিকিট নেই। এই তারিখগুলোয় কাউন্টারগুলোতে কোনো টিকিট মিলছে না।

শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের আশপাশে থাকা বিভিন্ন দুরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোতে খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য জানা গেছে।

শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার আসাদ জানান, এবার গত তিন মার্চ থেকে তারা আগাম টিকেট বিক্রি শুরু করেছেন। টিকিট বিক্রির নির্ধারিত তারিখের দুই দিনের মধ্যে তাদের টিকেট শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র শুক্রবার থেকে আগামী ১৫ তারিখের টিকেট পাওয়া যাচ্ছে তবুও অল্প কিছু।

হানিফ পরিবহনের কাউন্টারের কর্মী সোহান বলেন, আমাদের কাছে এখন আর আগামী ১৬ মার্চ থেকে ১৯মার্চ পর্যন্ত কোনো টিকেট পাবেন না। এখনই অনেক চাপ। কেউ টিকিট চাইলে দুই একটি থাকলেও সেটি আমরা পিছনের দিকে সিট দিচ্ছি।