ভাষা শহীদদের স্মরণ করার মাস ফেব্রুয়ারির নবম দিন আজ সোমবার। শোক-উৎসবের অনির্বচনীয় আবেগ নিরন্তর বইছে প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষীর শিরায় শিরায়। ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের ঐতিহাসিক চুক্তির ৩ নম্বর দফায় পরবর্তী প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপনের অঙ্গীকার থাকায় ভাষা আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে।

এই চুক্তিতে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে গ্রেফতারকৃত সকলকে মুক্তিদান এবং সংগ্রাম পরিষদের সকল দাবি মেনে নেয়ায় ছাত্র, জনসাধারণ অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সত্যিই এ ছিল এক অনন্য বিজয়।

রাজনীতিবিদ-সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের লেখা তৎকালীন কলকাতার ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় নিবন্ধ থেকে আন্দোলনের সফলতার প্রমাণ মেলে। তিনি লিখেছেন, “যে বিরাট শক্তির ও দুর্জয় বিরোধিতার মধ্যে সংগ্রাম করিয়া বাংলা ভাষা আন্দোলনকারীগণ যে সাফল্য লাভ করিয়াছেন তাহা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে। ১৯৪৯ সালের ২৬ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ভাষা কমিটির পক্ষ থেকে নঈম উদ্দীন আহমদ আরবি হরফে বাংলা লেখার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এ সময় লিয়াকত আলী খান ঢাকায় এলে তার কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ (ডাকসু)-এর পক্ষ থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পেশ করা হয়।

১৯৫১ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি জ্ঞানতাপস বহু ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, গণপরিষদ সদস্য, অধ্যাপক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মচারী, লেখক, শিক্ষক, ছাত্র, পুস্তক প্রণেতাসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চিন্তাবিদগণ একটি স্মারকলিপি প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পেশ করেন। উক্ত স্মারকলিপিতে বাংলাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা অভিহিত করে ওই বছরের পহেলা এপ্রিল থেকে সকল সরকারি কর্মচারিকে কার্যাদি বাংলা ভাষায় শুরু করার দাবি জানানো হয়। ১১ মার্চ ভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হরতাল পালিত হয়। এভাবেই ধাপে ধাপে ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক, কবি ও কলামিস্ট আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্রেখ করেন, “বায়ান্নর ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসভার পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য বিভিন্ন সংগঠনের কর্মপ্রস্তুতি নিরলসভাবে চলতে থাকে। ছাত্রসমাজে হঠাৎ করেই যেন তৎপরতার জোয়ার সৃষ্টি হয় এবং আশ্চর্য যে ঐ জোয়ার শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশব্যাপী ছাত্রসমাজ এবং তাদের সমর্থনে অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য তৎপর হয়ে উঠে।