ঢাকাসহ সারাদেশে তীব্র শীত পড়েছে। একইসাথে দেশের উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। সারাদেশে তাপমাত্রা কমতে থাকায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। গত কয়েকদিনের ঘন কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো শীতে উত্তরবঙ্গের দরিদ্র ও অসহায় মানুষেরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমার, গঙ্গাধর ও ধরলা নদীর তীরবর্তী চর এলাকার মানুষ বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন। এই শীত আরও চার দিন থাকবে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অফিস। ফলে নতুন বছর শুরু হবে শীতের তীব্রতা দিয়েই। আবার নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আসতে পারে শৈত্যপ্রবাহ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে। গতকাল শুক্রবার ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া রাজশাহীতে ১০.৪, রংপুরে ১১.২, ময়মনসিংহে ১১.৫, দিনাজপুরে ১১.৫, সৈয়দপুরে ১১.৪, তেঁতুলিয়ায় ১১.০, কুড়িগ্রামে ১১.৪ এবং চুয়াডাঙ্গায় ৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চুয়াডাঙ্গা জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গতকাল ছিল ৯ ডিগ্রি। এ সময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ।

কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ব্রহ্মপুত্র ঘাটের মাঝি শাহ আলম জানান, ঘন কুয়াশার কারণে নৌকা চালানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। গত দু’দিন ধরে তার কোনো আয়-রোজগার নেই। তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু শীতবস্ত্র বিতরণ করা হলেও চরের অনেক মানুষের কাছে তা এখনও পৌঁছায়নি। তীব্র শীতে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। সাধারণত কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে ওই এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে চলতি মাসের শেষার্ধে এক বা দুটি মৃদু বা মাঝারিমাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে আগেই জানানো হয়েছিল। সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, সাধারণত যদি আশপাশের কমপক্ষে দুটি স্টেশনের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে, কমপক্ষে দুদিন এমন নিম্নমুখী তাপমাত্রা অব্যাহত থাকে এবং স্বাভাবিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থেকে যদি ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে, তখন আমরা শৈত্যপ্রবাহ বলে থাকি। এ মৌসুমে এখনো এই পরিস্থিতি হয়নি, আগামী বছরের শুরুতে হয়তো তাপমাত্রার পারদ নিচে নামতে পারে।’

তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং ঘন কুয়াশায় বাড়ছে শীতের অনুভূতি। ভারতের উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড ও বিহার থেকে আসা কুয়াশার চাদর দেশের উত্তরবঙ্গ, সিলেট, ঢাকার উত্তরাংশ হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া কুয়াশায় সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারছে না। এতে দিনের তাপমাত্রা বাড়ছে না বলে শীতের অনুভূতি বাড়ছে।

জানা যায় দেশের ৬২টি আবহাওয়া স্টেশনে ভিজিবিলিটি উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। আবহাওয়াবিদরা জানান, দিনের সবচেয়ে বেশি কুয়াশা থাকে সূর্যোদয়ের সময়। এর কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিমানবন্দর আবহাওয়া স্টেশনের পূর্বাভাস কর্মকর্তা এসএইচএম মোসাদ্দেক বলেন, ‘রাত ৩টার পর থেকেই ঘন কুয়াশা বাড়তে থাকে। তবে এই কুয়াশার সঙ্গে সূর্যোদয়ের সময় একটি লেয়ার যুক্ত হলে কুয়াশার ঘনত্ব দ্রুত বেড়ে যায়। এজন্য সূর্যোদয়ের আগ থেকে শুরু করে সকাল প্রায় ৯টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশা বেশি থাকে।

বর্তমানে দেশে যে ঘন কুয়াশা এগুলো ভারতের উত্তরাখণ্ড, উত্তর-পূর্ব ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি ও বিহার হয়ে দেশে প্রবেশ করেছে বলে মন্তব্য করেন সাউথ এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ। তিনি বলেন, এই ঘন কুয়াশা আমাদের দেশের উত্তরবঙ্গ, সিলেট, ঢাকার উত্তরাংশ ও কুমিল্লা এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে। তবে তা বড়জোর দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এর বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। কবে নাগাদ এই ঘন কুয়াশা কেটে যেতে পারে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এখনই ঘন কুয়াশা কেটে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাধারণত কোথাও বৃষ্টি হলে কিংবা বাতাসের গতিবেগ বাড়লে ঘন কুয়াশা কমে যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে তেমন হওয়ার কোনো পূর্বাভাস নেই। তাই কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হলেও জানুয়ারি মাস বছরের সবচেয়ে শীতলতম মাস। বছরের এ সময়ে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। এ সময়ে সাধারণত উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শীতল বাতাস প্রবেশ করে থাকে।

মাগুরায় তীব্র শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন

শ্রীপুর (মাগুরা) সংবাদদাতা : মাগুরায় বেড়েই চলেছে শীতের তীব্রতা। পৌষ মাসের শুরুতে শৈত প্রবাহ, কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে জনজীবন বিপর্যস্ত। গত কয়েকদিনে শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ জবুথুবু হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সকাল থেকে শৈত প্রবাহ, তীব্র কুয়াশায় বেড়েছে শীতের তীব্রতা। সকাল থেকেই মিলছে না সূর্যের দেখা। তবুও ভোর হতেই কিছু কর্মব্যস্ত মানুষ বেরিয়ে পড়েছে কাজের সন্ধানে। শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় মাগুরার বিভিন্ন সড়কে ভোর হতেই মানুষের তেমন আনাগোনা নেই। ভোর থেকে মাগুরা একতা কাঁচা বাজারে সবজি বোঝাই করে বিভিন্ন নসিমন চলাচল করতে দেখা গেছে। এইসব নছিমনে শীতের সবজি ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, শীম বহন করতে দেখা যায়। নসিমনের চালকরা তীব্র শীত উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। কুয়াশা আর শৈত প্রবাহের কারণে সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ঘটছে দুর্ঘটনা। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলে সূর্যের ওকিঝুকি চোখে দেখা যায়। সূর্যের আলোর তীব্রতা কম থাকায় বেড়ে যায় আরো শীত।

অনেক রিকশা চালকরা বলেন, তীব্র শীতে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হতে পারছি না। পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা করে সড়কে তীব্র শীত উপেক্ষা করে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। সকালে তেমন যাত্রী পাওয়া যায় না। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সড়কে কিছু লোক বের হলেও রিকশায় উঠতে চায় না। তাই তীব্র শীতে পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে আছি।

নির্মাণ শ্রমিক হাতেম আলী বলেন, আজ দুদিন হল সূর্যের দেখা মিলছে না। তীব্র শীত উপেক্ষা করে কাজে আসতে চায় না শ্রমিকরা। তবুও পারিবারিক আর্থিক অভাব অনাটনের কারণে আমাদের কাজ করতে হয়। ইট, বালি, সিমেন্ট নিয়ে আমাদের কাজ থেমে নেই।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে তীব্র শীত উপেক্ষা করে কর্মক্লান্ত মানুষকে কাজে যেতে দেখা যায়। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সমাগম নেই।

এদিকে তীব্র শীত বেড়ে যাওয়ায় লেপ তোসকের দোকানে ভিড় বেড়েছে। মানুষ শীত থেকে বাচতে কম্বল ছেড়ে একটু স্বস্তির আশায় লেপতোষক বানানোর ব্যস্ততার সময় পার করছেন।

শীত বেড়ে যাওয়ায় শহরের ফুটপাতের দোকান গুলোতে শীতের এর কাপড় কিনতে নানা বয়সী মানুষের ভিড় বাড়ছে। নিম্নআয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত মানুষেরা শীতের কাপড় কিনতে ভিড় করছেন শহরের ফুটপাতে দোকান গুলোতে।

অন্যদিকে, শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ঠাণ্ড জনিত রোগের শিশুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।