পরকীয়ার জের ধরে রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুল হককে হত্যার পর লাশ কেটে ২৬ খণ্ড করা হয়। এরপর ঢাকায় হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের কাছে দুটি নীল রঙের ড্রামে ভরে রেখে যাওয়া হয়। এ হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা তারই বন্ধু জরেজুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এদিকে নিহতের প্রেমিকা শামীমা আকতার কোহিনুরকে (৩৩) গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ডিবি ও র‌্যাবের পৃথক অভিযানে শুক্রবার রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় অভিযান চালিয়ে জরেজুল ও কোহিনুরকে গ্রেফতার করা হয়। পরে র‌্যাব ও ডিবি পৃথকভাবে হত্যারহস্য উন্মোচনের কথা জানায়।

ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হক (৪৩) তিনদিন আগে বন্ধু জরেজ মিয়ার সঙ্গে ঢাকায় আসেন। এরপর থেকে তার খোঁজ মিলছিল না। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের কাছে দুটি নীল রঙের ড্রাম খুলে অজ্ঞাতপরিচয় এক পুরুষের খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পায়। তখন মরদেহ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। পরে দুটি নীল রঙের ড্রাম থেকে মরদেহ বের করা হয়। ড্রামের মধ্যে চাল ছিল এবং কালো পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছিল লাশের খণ্ডিত অংশগুলো। পরে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট এসে খণ্ডিত লাশের ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে পরিচয় শনাক্ত করে। এ ঘটনায় নিহতের ছোট বোন মোছা. আনজিরা বেগম শাহবাগ থানায় বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় নিহত আশরাফুলের বন্ধু জরেজ মিয়াকে প্রধান আসামি করে এজাহার দায়ের করা হয়।

এজাহারে আনজিরা বেগম লিখেছেন, তার বড় ভাই আশরাফুল হক দিনাজপুরের হিলি বন্দর থেকে সারাদেশে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আলুসহ কাঁচামাল সরবরাহ করতেন। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে আসামি জরেজকে নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। এরপর থেকে আশরাফুলের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। স্বজনদের সন্দেহ, আসামি জরেজ তার সহযোগী অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহযোগিতায় গত ১১ নভেম্বর রাত থেকে ১৩ নভেম্বর রাতের মধ্যে যেকোনো সময় পূর্বপরিকল্পিতভাবে আশরাফুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর মরদেহ মোট ২৬টি খণ্ডে খণ্ডিত করে গুম করার উদ্দেশ্যে দুটি নীল রঙের ড্রামের ভেতর ভরে রেখে অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা।

এদিকে র‌্যাব জানায়, রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হককে প্রেমের ফাঁদে ফেলে এবং অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে টাকা আদায় করার টার্গেট ছিল জরেজুল ইসলাম ও প্রেমিকা শামীমা আকতার কোহিনুরের (৩৩)। এই মামলার প্রধান আসামি জরেজুলকে গ্রেপ্তারের পর শামীমাকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। শামীমা এ হত্যার পরিকল্পনা, ব্ল্যাকমেইলিং এবং লাশ গুমের পুরো সহযোগিতায় জড়িত ছিলেন। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন এসব তথ্য জানান। এর আগে গতরাতে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শামীমাকে। গ্রেপ্তারকৃত শামীমা আক্তার ওরফে কোহিনুরের দেয়া তথ্য ও মোবাইল বিশ্লেষণে র‌্যাব জানায়, মামলার প্রধান আসামি প্রেমিক জরেজুলের পরামর্শে ব্লাকমেইল করে ১০ লাখ টাকা অর্থ আদায়ের উদ্দেশে হানিট্রাপে ফেলা হয় ভুক্তভোগী আশরাফুলকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর শনিরআখড়ার একটি বাসায় আনা হয় আশরাফুলকে, সেখানে তাকে অচেতন করে অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করা হয়। র‌্যাব আরো জানায়, এক পর্যায়ে মামলার প্রধান আসামি জরেজ ভুক্তভোগী আশরাফুলকে হাতুরি দিয়ে আঘাত করে মুখে কসটেপ দিয়ে আটকায়। শ্বাস নিতে না পারায় ভুক্তভোগীর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে বাজার থেকে কেনা ড্রামে লাশ ২৬ টুকরো করে সিএনজি করে হাইকোর্ট মাজারগেটে ফেলে রাখে জরেজ ও শামীমা। আওয়ামী লীগের ঘোষিত লকডাউনে নাশকতা এড়াতে রাজধানীতে ১৩ নভেম্বর কড়া নিরাপত্তা ছিলো। এত নিরাপত্তা ও চেকপোস্ট এড়িয়ে লাশ শনিরআখড়া থেকে হাইকোর্ট নিয়ে নেয়ায় নিরাপত্তার ঘাটতি প্রশ্নে র‌্যাব আইনশৃঙ্খলার ঘাটতি নেই উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সবচেয়ে খুশির বিষয় দ্রুততম সময়ে আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে।