# ভালো নির্বাচনের জন্য আমরা লড়াই অব্যাহত রাখব : ড. বদিউল আলম মজুমদার
# নির্বাচনী ব্যয় কমানো না গেলে নির্বাচনোত্তর দুর্নীতি কমানো যাবে না : ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচায
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে নির্বাচনই এখন চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে নির্বাচন আদৌ হবে কি না বা হলেও এর গুণমান কেমন হবে। কয়টা বুথ দখল হলে বা কত শতাংশ ভোট পড়লে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে এমন প্রশ্ন সবার।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে সিরডাপ মিলনায়তনে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার অগ্রগতি নিয়ে এ গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়। গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সাবেক বিচারপতি এম এ মতিন। কি-নোট স্পিকার ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম প্রমুখ।
গোলটেবিল বৈঠকে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপেক্ষা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য আমরা লড়াই অব্যাহত রাখব।’
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গঠনের পর ১৮টি ক্ষেত্র সংস্কারে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে এ সংস্কার কমিশন। একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন এবং ভালো নির্বাচন আয়োজনে অনেক সুপারিশ করেছিল এই কমিশন। কয়েকটি সুপারিশ গ্রহণ করলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপেক্ষা করেছে নির্বাচন কমিশন।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল গেজেটে প্রকাশের আগে, তার সুষ্ঠুতা ও গ্রহণযোগ্যতা সার্টিফাই করে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধানের বিষয়ে আরপিও অধ্যাদেশে কোনো পরিবর্তন আনেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)।’
ড. বদিউল আলম জানান, ‘নির্বাচনী ব্যয়ের অনিয়ম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে একাধিক নির্বাচনী আসনের জন্য নির্বাচনী ব্যয় মনিটরিং কমিটি গঠন ও নির্বাচনী ব্যয় নজরদারি করার বিষয়েও কোনো উদ্যোগ নেয়নি ইসি।’
তিনি আরও বলেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ৫ বছরের আয়কর রিটার্নের কপি জমা দেওয়ার বিধান করা হয়। তবে আরপিও অধ্যাদেশ অনুযায়ী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের সর্বশেষ কর বর্ষের আয়কর রিটার্নের কপিও জমা দিতে হবে। একাধিক আসনে কোনো ব্যক্তির প্রার্থী হওয়ার বিধান বাতিল করার বিষয়টি আরপিও অধ্যাদেশে উপেক্ষিত বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, পরপর দুটি নির্বাচনে অংশ না নিলে দলের নিবন্ধন বাতিলের বিধান রাখা এবং প্রতি ৫ বছর পর পর দলের নিবন্ধন নবায়ন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আরপিও অধ্যাদেশে উপেক্ষা এছাড়াও কমিশন কিছু কিছু সুপারিশ গ্রহণ করেছে। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপেক্ষা করেছে।স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেয়ার পরিবর্তে ৫০০ ভোটারের সম্মতির বিধানের সুপারিশটি উপেক্ষিত আরপিও অধ্যাদেশে বলেও জানান তিনি।
নির্বাচনী ব্যয় কমানো না গেলে নির্বাচনপরবর্তী দুর্নীতি কমানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, নির্বাচনী ব্যয় কমানো না গেলে নির্বাচনোত্তর দুর্নীতি কমানো যাবে না। কারণ, এই ব্যয় পরে জনগণের কাছ থেকে আদায়ের চেষ্টা করা হয়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশন উভয়ের যে দায়িত্ব আছে, দুই ক্ষেত্রেই তা অবহেলা করা হচ্ছে। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের কোনো প্রক্রিয়া হলো না এবং এটা আমরা পারলাম না, সে কারণে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন তার সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারবে কি না, এটা এখন দেখার বিষয়।’
দেবপ্রিয় বলেন, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রিফর্ম ট্র্যাকার নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে; যেখানে নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, মিডিয়া, শ্রমসহ ১৮টি ডোমেইনের সংস্কারকাজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নির্বাচনসংক্রান্ত প্রায় ৫০টি ডকুমেন্টস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৩১টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র দুটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। একটি হলো জেন্ডার গ্যাপ কমানো এবং অন্যটি নির্বাচনের প্রাক্কালে যাঁরা ১৮ বছরে উপনীত হবেন, তাঁরা যাতে ভোটার তালিকায় যুক্ত থাকতে পারেন, সেটার ব্যবস্থা করা।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে নির্বাচনই এখন চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে নির্বাচন আদৌ হবে কি না বা হলেও এর গুণমান কেমন হবে। কয়টা বুথ দখল হলে বা কত শতাংশ ভোট পড়লে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে এমন প্রশ্ন সবার। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সূচক কী হবে এবং ‘অংশগ্রহণমূলক’ ও ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ শব্দ দুটির প্রকৃত অর্থ কী, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এ শব্দগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা না থাকলে নির্বাচনের গুণমান নিয়ে পরে বড় বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। এ জন্য সরকারের এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, এ সময়কে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যৌথভাবে সরকার, রাজনৈতিক দল, সেনবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জাতীয় ঐক্য দেখানোর এটিই সময়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নাগরিকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন নির্বাচন। সবাই বলেছেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে হবে। নাগরিকদের মনে দুটি শব্দ খুব বড়ভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে একটি ‘অংশগ্রহণমূলক’, অন্যটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’। এই শব্দ দুটির রহস্য উন্মোচনের দাবি জানিয়েছেন নাগরিকেরা। এই দুটি সূচকের ব্যাখ্যা যদি না পাওয়া যায়, তাহলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এর গুণমান নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হবে।
নাগরিকেরা নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শুধু ভোটের আগে নয়; বরং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার হাত থেকে সুরক্ষার ব্যাপারে আতঙ্কে আছে তারা।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর লুট হওয়া অস্ত্রের বহু অংশ এখনো বাইরে রয়ে গেছে। সীমান্ত দিয়েও অস্ত্র আসছে বলে শোনা যাচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর আরও অগ্রণী ভূমিকা দেখতে চায় নাগরিকেরা।