‘অখন্ড হিন্দুরাষ্ট্র সেনার’ ব্যানারে উগ্র হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠন ভারতের দিল্লীতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে ফের হামলা চালায়। বাংলাদেশ দূতাবাসের ফটকে প্রায় দুই শতাধিক উগ্র হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী সন্ত্রাসী জমায়েত হয়ে বাংলাদেশ বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে। গত রোববার বিকেল ৫টার দিকে তারা বিক্ষোভ করে। এরপর দিল্লীর বাংলাদেশ হাইকমিশনে সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতিকারীরা হামলা চালায়। এর আগে শনিবার রাত ৯টার দিকেও একবার বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ করে হামলা চালায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থীরা। এই নিয়ে পরপর দুইদিন হামলা করা হলো। এ সময় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। দুটি কূটনৈতিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে গত রোববারের হামলার বিষয়ে ঢাকা কিংবা দিল্লীর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেছেন, পরিস্থিতি উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় সব ভিসাকেন্দ্র (আইভ্যাক) সম্পূর্ণভাবে চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গতকাল সোমবার ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে আইভ্যাক পরিদর্শনে এসে এ কথা বলেন তিনি।

এই অবস্থায় দিল্লী ও আগরতলায় বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসা দেওয়া বন্ধ আছে সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানায়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এরা ‘অখন্ড হিন্দুরাষ্ট্র সেনার’ নামক উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য। এই উগ্রবাদী সংগঠনের অন্যতম একটি ঘোষিত লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে অখন্ড ভারতের অঙ্গীভূত করা। এই ঘটনার প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিত দায়িত্বরত সদস্যরা এ সময় নিরব ভূমিকা পালন করছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কেউ কেউ সন্ত্রাসীদেরকে উৎসাহ প্রদান করে। পরপর দুইদিন দূতাবাসের সামনে এহেন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ফলে হাইকমিশনে অবস্থিত কর্মকর্তা এবং পরিবারবর্গের সদস্যরা গভীরভাবে ভীত এবং সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।

এই ভিসা আবেদনকেন্দ্র চালুর বিষয়ে যা বললেন ভারতীয় হাইকমিশনার: ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা জানায়, গত সপ্তাহে নিরাপত্তাজনিত কারণে ঢাকার ভারতীয় ভিসা সেন্টার একদিনের জন্য বন্ধ রাখা হলেও পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তা পুনরায় চালু করা হয়। বন্ধের দিনে যাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিকল্প তারিখে ভিসা আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। হাইকমিশন আরও জানায়, চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেও মানবিক বিবেচনায় চিকিৎসাসহ জরুরি ভিসাসেবা চালু রাখতে সচেষ্ট রয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন। এ কারণে ঢাকা ছাড়াও খুলনা, সিলেট ও রাজশাহীর আইভ্যাক কেন্দ্রগুলোতে ভিসা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে চট্টগ্রামের আইভ্যাক সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ১৮-১৯ ডিসেম্বর রাতে চট্টগ্রামে সহকারী হাইকমিশনারের প্রবেশপথে হামলা ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় নিরাপত্তার গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরিদর্শনকালে আইভ্যাক কর্মকর্তারা হাইকমিশনারকে জানান, বিপুল পরিমাণ জাল নথি জমা পড়ছে এবং দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সার্ভারে হ্যাকের চেষ্টা করে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করছেন, যার কারণে প্রকৃত আবেদনকারীরা বৈধ অ্যাপয়েন্টমেন্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা এই সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার আশ্বাস দেন এবং আবেদনকারীদের বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে ও দালালদের এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সব ভিসাকেন্দ্র পূর্ণভাবে চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে উদ্ধৃত করে ফেসবুকে দেওয়া বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ‘একদল যুবক বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাসের ঘটনার প্রতিবাদ করে স্লোগান দিয়েছে, কিন্তু বেস্টনি ভেদ করা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির কোনো চেষ্টা ছিলো না।’ যদিও ভারতের এ বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। সপ্তাহখানেক ধরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপাড়েন বাড়ছে, এবং দুই দেশেই এ নিয়ে তিক্ত ঘটনা বেড়ে চলেছে। গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন এবং তার সন্দেহভাজন হামলাকারী ‘ভারতে পালিয়েছেন’- এমন খবর সামাজিক মাধ্যমে চাউর হওয়ার পর ঢাকায় মূলত ভারতবিরোধী প্রচারণা নতুন গতি পেয়েছে।

দিল্লীতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত শনিবার রাত নয়টার দিকে হাইকমিশনের সামনে ‘হিন্দু চরমপন্থীদের’ একটি দল বিক্ষোভ করে। শনিবার তারা বাংলাদেশ হাউসের মূল ফটকের সামনে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়। এ সময় তারা ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে গালিগালাজ করে। কিছুক্ষণ অবস্থানের পর এক সময় তারা সেখান থেকে চলে যায়। শনিবার রাতের ওই ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তবে, বিকালে ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন অভিযোগ করেছেন, ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের জন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।

শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্র ভাঙচুর : উগ্র হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি সংগঠনের চরমপন্থী সদস্যরা পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে ভিসা প্রদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (বিএইচপি), হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ও শিলিগুড়ি মহানগর সংগঠনের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সদস্যরা গতকাল সোমবার শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে দুপুরে এই হামলা চালায়। এসময় তারা বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ভিসা কেন্দ্র ঘেরাও করে।

দিল্লি ও কলকাতার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, কয়েক বছর ধরে ‘ডিইউডিজিটাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচারের ঘটনার প্রতিবাদে শিলিগুড়ির বাঘা যতীন পার্কে জমায়েত হন বিএইচপি, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, শিলিগুড়ি মহানগর সংগঠনের প্রায় শ’ তিনেক সদস্য। এরপর তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাংলাদেশের ভিসা অফিস ঘেরাও করেন। বিক্ষোভের সময় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, দীপু দাসের হত্যার বিচার ও দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানান।

এ সময় প্রতিনিধিদলের এক সদস্য ডিইউডিজিটালের কর্মকর্তাকে ফোন করে বলেন, ‘আপনাকে একটাই অনুরোধ, এই অফিসের তালা খুলবে না। আপনার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিন, এই অফিসের তালা খুলবে না। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হবে, আপনি এখানে ব্যবসা করবেন, সেটা হবে না। বাংলাদেশের ভিসাসংক্রান্ত ব্যানার অথবা বোর্ড আজকের মধ্যে সরিয়ে নিন।’

প্রতিনিধিদলের ওই সদস্য পরে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, তাঁরা সংগঠনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে জানাবেন। এখান থেকে যেন কোনো ভারতীয়, কোনো হিন্দু বাংলাদেশে না যায়, ব্যবসা না করে, সেটা তাঁরা চান। কলকাতা থেকে একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা ভেবে ডিইউডিজিটাল সোমবার বেলা তিনটার আগেই ভিসা কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর পুনরায় ভিসা কেন্দ্র চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়িতে ওই ভিসা কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কলকাতা দপ্তরে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশন। এদিকে গতকাল সোমবার দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন সব ধরনের কনস্যুলার সেবা ও ভিসা দেওয়া বন্ধ করেছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।