জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১৬ হাজার ৩২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ের মোট ১৮টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার ১০১ কোটি ১০ লাখ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ৫ হাজার ৬০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৩৭৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। গতকাল সোমবার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত ১৮টি প্রকল্পের মধ্যে ১৩টি নতুন এবং ৫টি সংশোধিত প্রকল্প।
সভায় পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, সমাজকল্যাণ ও নারী-শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ, স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লে. জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.), শিল্প ও গৃহায়ণ উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিদ্যুৎ-সড়ক-রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পরিবেশ-বন-পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের দুইটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প এবং মানসম্পন্ন বীজ আলু উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ জোরদারকরণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত সংস্করণ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় তিনটি অনুসন্ধান কূপ খনন এবং সোনাগাজীতে ২২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আজকের সভায় অনুমোদন পায়। এর মধ্যে রয়েছে মিরপুর ৯ নম্বর সেকশনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-২০২৪-এ আহত বা কর্মক্ষমতা হারানো জুলাইযোদ্ধা পরিবারের জন্য ১৫৬০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ এবং একই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের জন্য ‘৩৬ জুলাই’ আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্প। এ ছাড়া বাংলাদেশ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট আবাসিক এলাকাগুলোর জন্য অগ্নিনিরাপত্তা আধুনিকায়ন এবং সচিবালয়ে নতুন ২১ তলা অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পও অনুমোদিত হয়েছে।
সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা এমআরটি লাইন-৬ এর তৃতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং সিরাজগঞ্জ-রায়গঞ্জ (চান্দাইকোনা) সড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় অনুমোদিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের জাপান হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট স্কলারশিপ অনুমোদিত হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবন ইকো-সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম সংশোধনও অনুমোদিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ও কেন্দ্রীয় গবেষণাগারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প সম্পন্ন করার অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রকল্প ক্লাইমেট রেসপন্স রিপ্রোডাকটিভ হেলথ অ্যান্ড পপুলেশন সার্ভিস ইম্প্রুভমেন্ট এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের অত্যাবশ্যক কার্যক্রম বাস্তবায়ন প্রকল্প সভায় অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়া সভায় পূর্বে অনুমোদিত মোট ১৫টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়। এসবের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্র আধুনিকায়ন, বিভিন্ন জেলা স্টেডিয়াম উন্নয়ন, অটিজম একাডেমি (ঘঅঅঘউ), বিভিন্ন কলেজ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সবুজায়ন, নদী-খাল পুনঃখনন এবং দিনাজপুর পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নসহ আরো বেশ কিছু চলমান প্রকল্প।
শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি ও থাই প্রধানমন্ত্রীকে ড. ইউনূসের চিঠি
এদিকে সমবেদনা জানিয়ে থাউল্যান্ডের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চর্নভিরাকুল এবং শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানির ঘটনায় রাষ্ট্রপতি আনুরা কুমার দিসানায়েককে চিঠি দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে,গত ২৮ নভেম্বর তাদের চিঠি পাঠিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যা সম্পর্কে আমি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানতে পেরেছি, যা বহু মূল্যবান জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে এবং আমার নিজের পক্ষ থেকেÑ আমি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি, যারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই কঠিন সময়ে থাইল্যান্ডের সরকার এবং বন্ধুভাবাপন্ন জনগণের প্রতি আমাদের সমবেদনা ও প্রার্থনা রইল। আমি আশাবাদী, আপনার নেতৃত্বে থাইল্যান্ডের জনগণ খুব শিগগরই শোক ও ক্ষয়ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন। দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য বাংলাদেশ সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
অপরদিকে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতিকে লেখা চিঠিতে ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহ-এর ফলে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা শুনে আমি গভীরভাবে শোকাহত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা আবহাওয়া সংক্রান্ত সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ, সরকার এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে আমি শোকসন্তপ্ত পরিবার এবং শ্রীলঙ্কার জনগণকে গভীর সমবেদনা জানাই। যারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন এবং এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সকলের প্রতি আমাদের সমবেদনা ও প্রার্থনা রইলো। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের মানুষ শ্রীলঙ্কার বন্ধুভাবাপন্ন জনগণের পাশে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। বন্যা ব্যবস্থাপনা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজ, চিকিৎসা সহায়তা এবং অন্যান্য মানবিক প্রয়োজনে সহযোগিতাসহ যে কোনও সম্ভাব্য সহায়তা বা সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।